সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে প্রাণ গেল শিক্ষার্থীর, গ্রেপ্তার ৩
নিজস্ব প্রতিবেদন :
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ৯:৩৯ অপরাহ্ণ
সিলেট নগরের এয়ারপোর্ট থানার ইলাশকান্দি এলাকায় দুই কিশোর গোষ্ঠীর পূর্বের দ্বন্দ্ব বৃহস্পতিবার আবারও বিস্ফোরিত হয়। আর সেই সংঘর্ষই কেড়ে নিল ১৭ বছর বয়সী শাহ মাহমুদ হাসান তপুর জীবন। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত তপু অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোরে মারা যায়। ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে ছড়িয়ে থাকা রক্তচিহ্ন ও স্থানীয়দের আতঙ্কিত সাক্ষ্য বলছে একটি ছোট্ট উত্তেজনা কীভাবে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এলাকার দুই কিশোর গোষ্ঠীর মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। বিষয়টির সূত্রপাত ছিল কয়েকদিন আগের একটি তুচ্ছ ঝগড়াকে কেন্দ্র করে, যা ধীরে ধীরে প্রতিশোধপরায়ণ রূপ নেয়। এ সময় খাসদবীর এলাকার কিশোরদের একদল হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ দলের নেতৃত্বে থাকা মো. জাহিদ হাসান তপুকে লক্ষ্য করে ধারালো ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই উপস্থিত কিশোররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
তপুকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা চেষ্টা চালালেও শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার মৃত্যুতে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
রক্তাক্ত সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসএমপি এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ সরাসরি অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় রাতভর তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারির পর শুক্রবার দুপুরের আগেই প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসানকে গ্রেফতার করা হয়।
তার সঙ্গে আরও দু’জন সহযোগী মো. অনিক মিয়া ও মো. জুনায়েদ আহমদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনজনই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এসএমপি’র অতিরিক্ত উপকমিশনার মিডিয়া মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, আমরা অত্যন্ত দ্রুত সময়ে অভিযুক্তদের আটক করতে সক্ষম হয়েছি। কিশোর তপুর মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। নিহতের পরিবার এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেয়নি; তবে পুলিশ নিজ উদ্যোগেই আইনগত প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।
ইলাশকান্দি এলাকায় শুক্রবার সকাল থেকেই মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। তপুকে শান্ত-স্বভাবের ছেলে হিসেবে জানতেন অনেকেই। কেউ কেউ হতবিহ্বল কণ্ঠে বলছিলেন, এত ছোট একটা ঝগড়ায় ছেলের জীবন শেষ হয়ে যাবে ভাবতেই পারছি না।
শিক্ষকরা বলছেন, কিশোর অপরাধ ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকার এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিশোর সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সামান্য তর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস কিংবা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা প্রায়ই ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ইলাশকান্দির এই ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতারই একটি রূপ বলে মনে করছে পুলিশ।
অপরাধ পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিবারের অনুপস্থিতি, অভিভাবকদের শিথিল নজরদারি, ইন্টারনেটের বেপরোয়া ব্যবহার এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা এসবই কিশোরদের এ ধরনের অপরাধে ঠেলে দিচ্ছে।
এডিসি মিডিয়া সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, এ ঘটনায় জড়িত কেউই ছাড় পাবে না। নিহতের পরিবারের অভিযোগ না থাকলেও পুলিশের নিজস্ব তদন্তে যে তথ্য মিলবে, তার ভিত্তিতেই মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, আটক তিনজনের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং-এর কার্যকলাপ, পূর্বের অপরাধ, সংঘর্ষের উৎস এবং ব্যবহৃত অস্ত্র এসব বিষয়ে আলাদা তদন্ত চলছে।
তপুর পরিবার তার মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া না গেলেও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তারা ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জেনে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। একজন স্বজন বলেন, আমাদের ছেলে আর ফিরবে না। কিন্তু যেন আর কারও সন্তানের জীবন এমনভাবে শেষ না হয় এইটাই চাই।
ইলাশকান্দির এই মৃত্যু আবারও দেখিয়ে দিল কিশোর অপরাধ যে কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমাজ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়। তপুর মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।




