২০২৫ সাল : আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সিলেটের সাদা পাথর
নিজস্ব প্রতিবেদন :
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ৮:৪৮ অপরাহ্ণ
২০২৫ সালজুড়ে সিলেটের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল আর প্রশাসনিক টানাপোড়েনের ভিড়ে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ঘিরে লুটপাটের ঘটনা দেশজুড়ে নাড়িয়ে দেয় জনমত।
বিশেষ করে ৯ ও ১০ আগস্ট—এই দুই দিন যেন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয় দেশকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন জাতীয় আলোচনার শীর্ষে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে থাকে সাদাপাথর কেন্দ্র থেকে দলবেঁধে পাথর লুটের দৃশ্য। মুহূর্তেই তা ছাপিয়ে যায় অন্য সব ইস্যু।
সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন পাথর কোয়ারিতে নির্বিঘ্নে লুট চললেও তাতে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। কিন্তু সাদাপাথর এলাকায় কথিত শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ লুট দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। প্রশাসন হঠাৎ করেই সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামে। শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। জনমনে তখন একটাই প্রশ্ন—উপদেষ্টাদের ওপর হামলার ঘটনা না ঘটলে কি রাষ্ট্র এতটা সক্রিয় হতো?
ঘটনার পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যেই উদ্ধার করা হয় প্রায় ৩০ লাখ টন পাথর। দেড় মাসের ব্যবধানে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয় আগের পরিবেশ। একই সঙ্গে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মী, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনসহ কয়েকজনকে বরখাস্তও করা হয়। তবে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন থেকেই যায়।
সাদাপাথর লুটে জড়িতদের শনাক্ত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৃথক তালিকা তৈরি করে। দুদকের তালিকায় সিলেট মহানগর বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ ছয় নেতাসহ ৪২ জনের নাম উঠে আসে। জেলা প্রশাসনের তালিকায় ছিল ১৩৭ জন। জাতীয় দৈনিকে এই তালিকা প্রকাশ হলে সিলেটের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে পাথর লুটে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, সরকার পতনের পর দেড় বছরে সিলেটের বিভিন্ন পাথর কোয়ারি ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজার কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। এর মধ্যে ৫ থেকে ৭ আগস্টের মধ্যেই সাদাপাথর এলাকা থেকে লুট হয় প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর। আর আলোচিত ৯ ও ১০ আগস্ট—এই দুই দিনে লুটের পরিমাণ ছিল ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। এই পর্যায়ে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি নড়েচড়ে বসে। লুট বন্ধে স্টোন ক্রাশার মিলগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
সারা বছর পাথর ও বালু লুট হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) ছিল কার্যত নিষ্ক্রিয়। তবে সাদাপাথর কাণ্ডের পর প্রথমবারের মতো সংস্থাটি মামলা করে। ১৫ অক্টোবর কোম্পানীগঞ্জ থানায় বিএমডির যুগ্ম পরিচালক হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা দেড় হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পাশাপাশি ভোলাগঞ্জে পাথর লুটে জড়িতদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ২০ আগস্ট জেলা প্রশাসন ১৩৭ জনের তালিকা জমা দেয়। চলতি বছরের শেষ দিন পর্যন্ত অন্তত ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়।
২০২৫ সালে পাথরকাণ্ডের পাশাপাশি সিলেটকে আলোচনায় রাখে আরও কয়েকটি ঘটনা। ১৪ জুন জাফলং পর্যটন কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ফাওজুল কবির খানের গাড়িবহর আটকে বিক্ষোভ হয়। ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের নেতাদের নেতৃত্বে সংঘটিত ওই ঘটনায় কয়েকজনকে বহিষ্কার করে বিএনপি। এ ছাড়া আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার প্রধান আসামি বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবরের জামিন লাভ ও পলাতক থাকা এবং ১১ মে ও ১৭ অক্টোবর আদালতপাড়ায় আসামিদের ওপর হামলার ঘটনাও বছরজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৫ সাল শেষে দাঁড়িয়ে সাদাপাথর তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদের গল্প নয়—এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতা, লুট, নীরবতা ও নির্বাচনী রাজনীতির এক প্রতীকী দলিল।




