নবীগঞ্জে হাওড়ে পড়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:১৭ অপরাহ্ণ
সবুজ ধানক্ষেত আর নীরব হাওড়ের মাঝখানে পড়ে আছে এক টুকরো বিশ্বইতিহাস। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের শ্রীমতপুর গ্রামের পাশের নিতনী বিল এলাকায় প্রায় ৮৪ বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত একটি যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক নিদর্শন আজও সংরক্ষণের অপেক্ষায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ধানক্ষেতের মাঝে মাটির ওপর যুদ্ধবিমানের কিছু ভাঙা ধাতব অংশ দৃশ্যমান। স্থানীয়দের দাবি, দৃশ্যমান অংশের নিচে মাটির তলায় এখনো চাপা পড়ে আছে বিমানের বৃহৎ অংশ। অবহেলায় পড়ে থাকা এই ধ্বংসাবশেষ দেখতে মাঝেমধ্যেই দূর-দূরান্ত থেকে কৌতূহলী দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীরা এখানে আসেন।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ১৯৪২ সালের দিকে আশ্বিন মাসের এক সকালে একটি যুদ্ধবিমান কালিয়ারভাঙ্গা ও শ্রীমতপুর গ্রামের আকাশে বারবার চক্কর দিতে থাকে। একপর্যায়ে বিকট শব্দে নিতনী বিলের হাওড়ে বিমানটি ভূপাতিত হয়। প্রচণ্ড শব্দে আতঙ্কিত স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেও চারদিকে ঘন ধোঁয়ার কারণে কিছুই দেখতে পাননি। ধোঁয়া কাটতে সময় লাগে কয়েক দিন। এমনকি দুর্ঘটনার ছয় দিন পরও বিমানের ভেতরে আগুন জ্বলতে দেখা যায় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পরবর্তীতে বিমানের জিনিসপত্র সংগ্রহের আশায় নৌকাযোগে কয়েকজন সেখানে গেলে ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। হঠাৎ করে বিমানের ভেতরে থাকা একটি মিসাইল বিস্ফোরিত হলে শ্রীমতপুর গ্রামের সাজিদ মিয়া ও খালেক মিয়া ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এ ঘটনার পর এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিন কেউ ওই স্থানের আশপাশে যেতে সাহস পাননি।
এলাকার শতবর্ষী কৃষক মাতাব মিয়া ও ইউসুফ মিয়াসহ প্রবীণরা জানান, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর পুরো এলাকায় আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছিল। বিস্ফোরণে মানুষের মৃত্যুর পর বহু বছর ধরে লোকজন ওই জমির পাশ দিয়েও যাতায়াত করতে ভয় পেতেন। আজও সেখানে গেলে অনেকের মনে সেই ভয়ের স্মৃতি ফিরে আসে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, দুর্ঘটনার পর তৎকালীন সময়ে সরকারি একটি বাহিনী একাধিক বোমা ব্যবহার করে বিমানটির কিছু অংশ ধ্বংস করে। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন কিছু অংশ সংগ্রহ করলেও বিমানের বড় একটি অংশ মাটির নিচেই থেকে যায়। সময়ের ব্যবধানে সেই ধ্বংসাবশেষকে রেখেই চারপাশে ধান চাষসহ স্বাভাবিক কৃষিকাজ চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় সরকারের একাধিক সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার বা সংরক্ষণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি বিধ্বস্ত বিমান নয়—এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। দ্রুত এই নিদর্শন উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হলে এখানে একটি ঐতিহাসিক স্থান গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের কথা।



