লাখাইয়ের কাবিখা প্রকল্পে দুর্নীতি: অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুদক
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:৪৩ অপরাহ্ণ
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় কাবিখা প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
চারটি ইউনিয়নের আটটি কাবিখা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৩৪ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে সংস্থাটি।
দুদকের সমন্বিত হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক ও তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) হবিগঞ্জ আমলী আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন- সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুশফিউল আলম আজাদ, সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আলী নুর, বুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট খোকন চন্দ্র গোপ, করাব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কুদ্দুস, মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোমান মিয়া এবং বামৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন ফুরুক।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২২–২০২৩ অর্থবছরে লাখাই উপজেলার করাব, বুল্লা, বামৈ ও মুড়িয়াউক ইউনিয়নের ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণের জন্য মোট আটটি কাবিখা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পগুলোর নামে বাস্তবে কোনো কাজ না করে কিংবা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বরাদ্দের পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে মুড়িয়াউক ইউনিয়নের দুইটি রাস্তার প্রকল্পে ১২ লাখ ৪০০ টাকা, বুল্লা ইউনিয়নের দুইটি প্রকল্পে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৭ টাকা, করাব ইউনিয়নের দুইটি প্রকল্পে ৮ লাখ ২০ হাজার ৬৯৪ টাকা এবং বামৈ ইউনিয়নের দুইটি প্রকল্পে ৫ লাখ ২৬ হাজার ২৫৮ টাকা আত্মসাৎ করেন। এভাবে মোট ৩৪ লাখ টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে বামৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন ফুরুক বলেন, তিনি কোনো অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত নন। তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে অর্থ ফেরত দিতে তিনি প্রস্তুত আছেন।
বুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এডভোকেট খোকন চন্দ্র গোপ দাবি করেন, তিনি নিয়মানুযায়ী কাজ করেছেন এবং কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে কাজ শেষ হওয়ার পর বন্যার কারণে রাস্তার ক্ষতি হওয়ায় কাজ কম মনে হতে পারে।
সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আলী নুর বলেন, দুই বছর পর প্রকল্পের পরিমাপ করলে মাটির পরিমাণ কিছুটা কম দেখা যাওয়া স্বাভাবিক, এটিকে অনিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, লাখাই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলামের দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে তদন্ত করা হয়।
প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। দোষীরা যেন কোনোভাবেই আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে না পারে, সে বিষয়ে দুদক সতর্ক রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৪ জুন লাখাই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম হবিগঞ্জের স্পেশাল জজ ও দায়রা জজ আদালতে একটি দরখাস্ত মামলা দায়ের করেন।
ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, আটটি কাবিখা প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা মূল্যের ৫৪০ মেট্রিক টন চাল আত্মসাৎ করা হয়েছে। আদালত ওই দিনই দুদককে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে প্রকল্পগুলোর বাস্তব কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
তবুও সংশ্লিষ্টরা বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করে নেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংশ্লিষ্ট ফাইল না পাওয়ার কথা জানান, যা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
তৎকালীন সময়ে এ বিষয়ে স্থানীয় এবং জাতীয় একাধিক গণমাধ্যমিক অসংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।



