সিলেটের কুষ্ঠ হাসপাতাল নিজেই এখন ‘রোগী’
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ৬:৪৯ অপরাহ্ণ
সিলেটের কুষ্ঠ হাসপাতাল দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম সরকারি কুষ্ঠ চিকিৎসাকেন্দ্র। অথচ হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা এমন যে, সেটিই যেন এখন নিজেই এক দণ্ডায়মান রোগী। জরাজীর্ণ ভবন, দেয়ালের ফাটল, ছাদ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি আর খসে পড়া পলেস্তারা—সব মিলিয়ে চিকিৎসক, কর্মচারী ও রোগীদের জন্য তৈরি হয়েছে স্থায়ী ঝুঁকি।
১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি দেশের তিনটি বিশেষায়িত সরকারি কুষ্ঠ হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ৮০ শয্যার হাসপাতালটিতে বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মাত্র ৪৮টি শয্যা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনটি ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ১৯ জন রোগী। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের তিনটি শৌচাগারের কোনো দরজা নেই। রোগী দেখার জন্য ব্যবহৃত মনিটরসহ বেশ কয়েকটি চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বাথরুমগুলো অপরিচ্ছন্ন। মূল ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। ঝুঁকি নিয়েই সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
হাসপাতালের কর্মীরা জানান, বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ সময় পলেস্তারা খসে পড়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। হাসপাতালের প্রধান সহকারী সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। ভবনটি এখন খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।’
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিষয়ক কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, জেলায় কুষ্ঠরোগী শনাক্তের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। ২০২০ সালে কুষ্ঠরোগী ছিলেন ২০ জন। এরপর ২০২১ সালে ৩৭ জন, ২০২২ সালে ৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৭৯ জন, ২০২৪ সালে ৫৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৮ জন রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়, এটি মৃদু সংক্রামক রোগ। জীবাণুর মাধ্যমে সংক্রমণ হয় এবং হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াতে পারে। শুরুতে চামড়ায় হালকা ফ্যাকাশে বা লালচে অনুভূতিহীন দাগ দেখা যায়, যেখানে চুলকানি বা ঘাম হয় না এবং লোম থাকে না। মুখ, ঘাড় বা বুকে ব্যথাহীন গুটি, কানের লতি ফুলে যাওয়া কিংবা হাত-পায়ে অনুভূতি কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানান চিকিৎসকেরা।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, বেশি রোগী শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে কুষ্ঠরোগ বাড়ছে। আগে অনেক রোগী শনাক্তের বাইরে থেকে যেতেন। এখন সচেতনতা বাড়ায় মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
হাসপাতালটির অবকাঠামোগত দুরবস্থার পেছনের ইতিহাসও দীর্ঘ। মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ৪ দশমিক ৭২ একর জমিতে ১৮৯০ সালে হাসপাতালটি যাত্রা শুরু করে। অনেক বছর পর ১৯৬৩ সালে তিনতলা ফাউন্ডেশনের একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়, যা পরে ধাপে ধাপে তিনতলায় উন্নীত করা হয়। ফলে ভবনটি এখন অত্যন্ত পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও সংস্কার বা পুনর্নির্মাণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
রোগীদের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৭০ বছর বয়সী এক রোগী বলেন, তাঁর হাত পচে গিয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা সব বাইরে করতে হয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে তেমন কোনো সুবিধা নেই। ৬৫ বছর বয়সী আরেক রোগী বলেন, ‘দিনে একবার চিকিৎসক আসেন। তার ওপর বিল্ডিংয়ে থাকতে ভয় লাগে—যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।’
জনবল সংকটও প্রকট। হাসপাতালটিতে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৯ জন। কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ জুতা তৈরির কর্মীর পদটি ২০২১ সাল থেকে শূন্য। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যাও কম। ফলে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নাহিদ রহমান বলেন, ‘দেশের তিনটি কুষ্ঠ হাসপাতালের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। অথচ অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। আমরা বারবার জানিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।’
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে সীমিত জনবল ও নষ্ট সরঞ্জাম নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—দেশের বৃহত্তম কুষ্ঠ হাসপাতালকে সুস্থ করতে কবে নেওয়া হবে কার্যকর উদ্যোগ?





