যুদ্ধ ভীতিতে ইরানিরা খাদ্য মজুত করছেন
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:১৪ অপরাহ্ণ
গত ৩০ জানুয়ারি রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ইরানিদের মধ্যে এক চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুজব ছড়িয়ে যায়, যে কোনো মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালাবে। আর এই আশঙ্কা এখনো ইরানের জনগণের মধ্যে রয়ে গেছে। যদিও আলোচনার ব্যবস্থা চলছে বলে জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। তারপরও ইরানিরা নিজেদের জানালাগুলো শক্তভাবে বন্ধ করে দিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি মজুত করে রাখছেন।
মিলাদ ছদ্মনামে তেহরানের বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সি প্রকৌশলী বলেন, ‘আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম, কখন আঘাতটা আসবে। সকাল পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। বারবার জেগে উঠছিলাম, বিস্ফোরণের কোনো শব্দ শুনি কি না, সেটাই কান পেতে শুনছিলাম। আজ রাতে কী হয়, দেখা যাক।’ ৬৮ বছর বয়সি শোহরেহ বলেন, ‘আজ (৩১ জানুয়ারি রাতে) আমার সব বন্ধুই বলছিল, আজ রাতেই আঘাত আসবে।’
শোহরেহ ইরানে বিদেশি হামলার বিরোধী। তিনি বলেন, মানুষের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, সবাই যেন মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ওরা ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ইসলামিক রিপাবলিক যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তাতে মানুষ ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছে। তারা আর বুঝতে পারছে না কোনটা তাদের পক্ষে, আর কোনটা তাদের বিপক্ষে।’
এক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন আবারও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঢাক পেটাচ্ছে। এর ফলে সংঘাতের আশঙ্কা ইরানিদের কাছে বাস্তব ও তাৎক্ষণিক ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক বহর মোতায়েন শুধু সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে বহু বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির পথই খুলে দেয়নি; ইরানিদের জন্য এটি নিয়ে এসেছে বিভ্রান্তি, মানসিক চাপ এবং এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের আশঙ্কা।
সরকারি কর্মচারী ৩২ বছর বয়সি আরজু মানুষের মধ্যে থাকা এক নীরব উদ্বেগের কথা বলেন। অনেকে যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো নিয়ে কথা এড়িয়ে চলছেন, যেগুলো গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ভয়ংকর যুদ্ধের কারণে সবারই চেনা। সবাই শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবাই অপেক্ষা করছে প্রথম বিস্ফোরণের। তিনি বলেন, ‘আমার বাসার সামনে যে ভবন, সেখানে থাকা আমার এক প্রতিবেশী তার জানালা বন্ধ করে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সে বলেছে, ‘জানালা বন্ধ করে দাও। বোমা পড়লে তখন শাসক আর বিরোধীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।’
বিক্ষোভ দমনের সময় তিন সপ্তাহের ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবার চালু হয়েছে। এখন সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা থেকে বাঁচার নানা পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ছে। পরামর্শের তালিকা দীর্ঘ—১০ দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখা; হাতের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স রাখা; পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত নেওয়ার জন্য একটি ব্যাগে রাখা; জরুরি বের হওয়ার পথ খোলা রাখা; বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে খোলা জায়গায় চলে যাওয়া; দেয়ালের পাশে মাটিতে শুয়ে পড়া। ফারসি ভাষার প্ল্যাটফর্মগুলোতে এমন আরও অসংখ্য নির্দেশনা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই পরামর্শগুলোর উৎস অনেক সময়ই স্পষ্ট নয়। জুনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় যেসব বট সক্রিয় ছিল, যারা ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভিকে প্রচার করছিল, তারাই কি এর পেছনে আছে, সেটাও জানা যায়নি। তবে যে-ই থাকুক, এসব বার্তার প্রভাব স্পষ্ট। আরজু বলেন, তিনি এসব বার্তা দেখেছেন এবং ‘যদি কিছু হয়’ এই ভেবে ঘরে ১০ বোতল পানি ও কয়েক ক্যান খাবার রেখে দিয়েছেন।
৭৫ বছর বয়সি আমিন নামে এক কিডনি রোগী জানান, তিনি গত সপ্তাহে তিন মাসের ওষুধ কিনে এনেছেন এবং সেগুলো বাড়িতে রেখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই পরামর্শগুলোর কিছু হয়তো মিডিয়ার কারসাজি। তবু সাবধানতার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রেখেছি। আগামীকাল কী হবে, কেউ জানে না।’ আমিন ইরান-ইরাক আট বছরের যুদ্ধ এবং গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ— দুটোই দেখেছেন। নিজের দেশকে আবারও যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত।
এই ভয় আর প্রস্তুতি শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০ লাখ ইরানি প্রবাসীর মধ্যেও একই আশঙ্কা কাজ করছে। অনেকে ভয় পাচ্ছেন, আবারও দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে, যেমনটা ১২ দিনের যুদ্ধ ও গত মাসের দমনপীড়নের সময় হয়েছিল। ফলে তারা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ হারাবেন। তারা নিজেদের পরিবারের জীবন নিয়েও উদ্বিগ্ন।
ইরানজুড়ে শহরগুলো এখনো তুলনামূলক শান্ত, অন্তত আপাতত। পেট্রলপাম্পে লম্বা লাইন নেই। দোকানপাট খোলা। মানুষ স্বাভাবিকভাবে কাজে যাচ্ছে। ভোরবেলা স্কুলপড়ুয়া শিশুরা স্কুলবাসের অপেক্ষায় বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তবু আতঙ্কের অনুভূতি সর্বত্র।
দীর্ঘ যুদ্ধ নয়, দ্রুত সময়ে হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের: ইরানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘসময় যুদ্ধ করতে চান না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর বদলে দ্রুত সময়ের হামলার পরিকল্পনা করছেন তিনি। কীভাবে দ্রুত হামলা চালানো সে ব্যাপারে কাজ করতে নিজের দলকে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। গতকাল এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল।
সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী বাহিনী জড়ো করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধজাহাজ ও সেনারা এমন জায়গায় অবস্থান করছেন যেখান থেকে ইরানে হামলা চালানো যাবে। এখন ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেবেন কীভাবে তাদের ব্যবহার করা হবে। তবে হামলা এমনভাবে হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য যুদ্ধ করতে হবে না। বর্তমানে ইরানে বিপুল বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যেটির প্রভাবে সরকারের পতন হয়ে যেতে পারে।
আবার একই সময় সরকারি অবকাঠামোর ওপর প্রথমে প্রতীকী হামলা চালানো হতে পারে। এরপর ইরান যদি তাদের দেওয়া শর্তে রাজি না হয় তাহলে পরবর্তীতে হামলা তীব্র করার সুযোগ রাখা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু: ওয়াশিংটন ও তেহরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইরানের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে ওই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি না হলে কিংবা বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ না করলে ইরানে বারবার হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই হস্তক্ষেপের হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নৌ উপস্থিতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ‘(ট্রাম্প) নিয়মিতই বলেন যে, তিনি রণতরী এনেছেন। এসব দেখে ইরানি জাতি ভয় পায় না। ইরানি জনগণ এসব হুমকিতে বিচলিত হবে না।’
তিনি বলেন, আমরা হামলার সূচনাকারী নই এবং কোনো দেশকে আক্রমণ করতে চাই না; তবে যে কেউ আক্রমণ কিংবা হয়রানি করলে ইরানি জাতি তার বিরুদ্ধে শক্ত আঘাত হানবে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনায় কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা এমন ‘ন্যায্য’ আলোচনার জন্য প্রস্তু ; যা তাদের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে নয়।





