মৌলভীবাজারের চা-বাগানে ৯ হাজার শিশুর শৈশব আজও শিক্ষাবঞ্চিত
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:২৫ অপরাহ্ণ
মৌলভীবাজারের সবুজ চা-বাগান দূর থেকে যতটা সুন্দর, ভেতরের বাস্তবতা ঠিক ততটাই বেদনাদায়ক। সারি সারি চা-গাছের ফাঁকে ফাঁকে বেড়ে ওঠা হাজারো শিশুর চোখে আছে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও আটকে আছে ভাঙা টিনের ঘর আর অবহেলার দেয়ালে।
জেলার ৯২টি চা-বাগানের মধ্যে ৬৯টিতে থাকা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রায় ৯ হাজার শিশু। অথচ বছরের পর বছর ধরে তারা প্রকৃত অর্থেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নেই শিক্ষক, নেই বেঞ্চ-ডেস্ক কিংবা বই–খাতার মতো ন্যূনতম শিক্ষা উপকরণ।
কমলগঞ্জ উপজেলার দুর্গম সুনছড়া (দেবলছড়া) চা-বাগানে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে বসে প্রায় ২০০ শিশু। বাঁশের বেড়া দিয়ে একটি ঘরকে ভাগ করে বানানো হয়েছে দুইটি শ্রেণিকক্ষ। জায়গা না থাকায় পাশের বাংলোর বারান্দাতেও চলে পাঠদান। পুরো বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র তিনজন। মাস শেষে তাঁদের কেউ কেউ পান মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী—যা একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরির সমান।
সহকারী শিক্ষক মিটুন কুর্মীর কণ্ঠে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস-অনেক কষ্ট করে পড়াই, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ তাকায় না।
একই রকম কষ্টের গল্প শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুরভুরিয়া চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। ১১ বছর আগে জাতীয়করণ হলেও আজও নেই পাকা ভবন। বর্ষায় শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে, গরমে নিঃশ্বাস নেওয়াও কষ্টকর হয়ে ওঠে। বেঞ্চ না থাকায় শিশুরা মাটিতে বসেই শেখার চেষ্টা করে—যেন মাটির কাছেই তাদের ভবিষ্যৎ বেঁধে রাখা হয়েছে।
এই অবহেলার ফল ভয়াবহ। প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে ৩০–৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী। মাধ্যমিকে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই হারিয়ে যায় ৭০–৮০ শতাংশ শিশু। শিক্ষা যেন তাদের জীবনে এক ক্ষণিকের অতিথি।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, বারবার আন্দোলন, স্মারকলিপি—সবই হয়েছে। কিন্তু বদলায়নি বাস্তবতা। গবেষক অধ্যাপক ড. আশরাফুল করিমের কথায় স্পষ্ট সত্যটি উঠে আসে—শিক্ষা ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রতিটি চা-বাগানে অন্তত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা জরুরি।”
সবুজ চা-বাগানের ছায়ায় বড় হওয়া এই শিশুদের স্বপ্ন খুব বড় নয়—একটি নিরাপদ স্কুলঘর, একজন নিবেদিত শিক্ষক, আর শেখার ন্যূনতম সুযোগ। প্রশ্ন একটাই—আর কতদিন তারা অপেক্ষা করবে শিক্ষার আলো দেখার জন্য?





