যাদু–বিদ্যা আর তন্ত্রমন্ত্রেই যাদের জীবন–জীবিকা
বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:৫৭ অপরাহ্ণ
যাদু–বিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র আর ঝাড়ফুঁক—এই পেশাকে ঘিরেই যাদের জীবন-সংসার চলে, সমাজের চোখে তারাই বেদে সম্প্রদায়। দল বেঁধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানো এই মানুষগুলোর জীবনধারা মূলধারার সমাজ থেকে আলাদা। তবু তারাও এ দেশের নাগরিক, নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছেন।
দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছোট ছোট বহর তৈরি করে ঘুরে বেড়ানোই তাদের জীবন। নিজস্ব কোনো স্থায়ী সম্পত্তি নেই। তাই জমিজমা নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব—এসব তাদের জীবনে খুব একটা জায়গা পায় না। তাদের চাওয়া একটাই—এই পেশার মাধ্যমে কোনোরকমে সংসার চালানো এবং সন্তানদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়া।
বেদে সমাজে অনেক সময় কিশোর বয়সেই ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে দেখা যায়। বাস্তবতার চাপে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলে জানান অনেকেই। তবে এই চর্চার ব্যতিক্রমও আছে। তেমনই একজন হলেন মো. আব্দুল ওয়াহাব সর্দার। তিনি বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন বেদে বহরগুলোতে বাল্যবিবাহ ও যৌতুক নিষিদ্ধ বলে জানান তিনি।
আব্দুল ওয়াহাব সর্দারের বাবা আনছার আলী। তাঁর জন্ম দিনাজপুর জেলার রৌহজং উপজেলায়। বর্তমানে বানিয়াচং থানার আশপাশে অবস্থান করা বেদে বহরগুলোতে ঘুরে শোনা যায় জীবনসংগ্রামের নানা গল্প। ঝড়-তুফান কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয় তাদের। জন্মের পর থেকেই অনেক শিশু তাদের পূর্বপুরুষের আদি পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যাদু–বিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র আর ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমেই পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয় তাদের।
বেদে সম্প্রদায়ের সদস্য আব্দুল হক বলেন, যাদু–বিদ্যা মূলত হাতের কৌশল ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে আমরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারি। এখানকার মানুষ আমাদের ভালোভাবে গ্রহণ করে। তাই প্রতি বছর বের হলে একাধিকবার সিলেট অঞ্চলে আসি।’
তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। ‘আমাদের সমাজে ধনী মানুষও আছেন, কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। আমাদের নিয়ে কেউ ভাবেও না,’—বলছিলেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বানিয়াচং উপজেলা থানা সংলগ্ন এলাকা, নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের মিঠাপুর গ্রামের গেটসংলগ্ন স্থান, শেরপুর–নবীগঞ্জ সড়কের পাশে এবং নবীগঞ্জ–হবিগঞ্জ সড়কের শিবগঞ্জ এলাকায় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি বেদে বহর অবস্থান করছে।
এ ছাড়া হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভেতরের গেটে প্রতিদিন বেদে সম্প্রদায়ের ১০–১৫ জন নারী ও কিশোরীকে ঝাড়ফুঁক ও সিঙ্গা লাগানোর জন্য মানুষ ডাকতে দেখা যায়। অনেকেই ২০–৩০ টাকার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে এসব সেবা নিচ্ছেন।
হবিগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৯টি উপজেলায় বেদে সম্প্রদায়ের নারী–পুরুষ মিলিয়ে মোট ৫৭৫ জন এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে বানিয়াচং উপজেলায় পুরুষ ৩২ জন ও নারী ১৪ জন, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় পুরুষ ১৯৮ জন ও নারী ১৪৩ জন, চুনারুঘাটে পুরুষ ৩৬ জন ও নারী ২০ জন, বাহুবলে পুরুষ ১৫ জন ও নারী ১১ জন, নবীগঞ্জে পুরুষ ৪৬ জন ও নারী ৫৪ জন এবং আজমিরীগঞ্জে পুরুষ ৪ জন ও নারী ২ জন রয়েছেন।





