মাঠে আলু, মনে দুশ্চিন্তা : ভোটে কৃষকের একটাই চাওয়া ন্যায্যমূল্য
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:০৯ অপরাহ্ণ
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠজুড়ে শুরু হয় আগাম জাতের আলু তোলার ব্যস্ততা। নারী শ্রমিকদের হাতের ছোঁয়ায় জমি থেকে ওঠা আলু মাঠেই বিক্রি করছেন কৃষকরা। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আনন্দ নেই কারও মুখে—ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা আর আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশা ও দুশ্চন্তাই এখন কালাইয়ের কৃষকদের মূল কথাবার্তা।
সকালবেলা মহিলা শ্রমিক নিয়ে জমি থেকে আলু তুলে মাঠেই বিক্রি করছেন কৃষকরা। পুরো মাঠেই চলছে আগাম জাতের আলু ওঠানোর ধম। এমন চিত্র জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার প্রত্যক মাঠে। এখানকার আলু যাচ্ছে স্থানীয় খুচরা বাজারসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে। এছাড়া বিদেশের মাটিতেও যাচ্ছে আগামজাতের এই এলাকার আলু।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে জয়পুরহাট-২ আসনের কালাই উপজেলার মুলগ্রাম মাঠে আগাম জাতের আলু ওঠাতে আসা বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কাজের ফাঁকে হয় ভোটের আলাপ। তাদের একটাই চাওয়া, আসছে নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা যেন কৃষকদের কথা ভাবেন। ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করেন। এলাকা ভিত্তিক সরকারি ভাবে হিমাগার নির্মাণ করেন।
৭০ শতাংশ জমিতে আলু চাষ করেছিলেন উপজেলার আঁওড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাফি (৫২)। গত সপ্তাহে ১ মণ (৪০ কেজি) সাদা জাতের মিউজিকা আলু জমি থেকে বিক্রি করেছেন ৮০০ টাকা। সেই আলু পরে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) জমি থেকে বিক্রি করে পেয়েছে ৩০০ টাকা। এ অবস্থায় ভোটের আলাপ তুলতেই হতাশার সুর কৃষক আব্দুল কাফির কণ্ঠে।
হতাশ কণ্ঠে কৃষক আব্দুল কাফি বলেন, ‘ভোট আসে, ভোট যায়, হামরা নেতাদের কথা মত ভোটও দেই। কিন্তু হামাগেরে মতো কিষানেগেরে তকদির বদলায় না। হামাগেরে চাওয়া, ভোটটা ভালো হোক, ভোট লিয়ে মারামারি-গন্ডগোল না হোক। ভোটের পরে দ্যাশটা ভালো থাকুক, হামাগেরে মতো চাষাভুষা মানুষের কষ্টের দিন শ্যাষ হোক। সার-কীটনাশকের দাম কমে যাক, ফসলের ভালো দাম থাকুক। চাল-ডালসহ বাজার নিয়ন্ত্রণে থাক। সাথে এলাকায় কয়েকটা সরকারি হিমাগার থাক। তাহলেই হামরা খুশি।’
জেলার কালাই উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হাতিয়র গ্রামের কৃষক আব্দুল গাফফার ১০০ শতাংশ জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ করেছিলেন। দাম কম হওয়ায় জমি থেকেই আলু বিক্রি করে দিশাহারা অবস্থা তাঁর। শ্রমিকদের সাথে তিনি নিজেও মাঠে কাজ করছিলেন। এই ফাঁকে ভোটের আলাপ তুলতেই আব্দুল গাফফার বলেন,‘অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। মাঠে-হাটে কোনোখানেই ব্যাচপার আসে ঠিকমতো দাম পাই না। ফরিয়াদের অত্যাচারে মনে হয় ফসল ফলানো বাদ দেই। অনেক দিন পর ভোট দিতে কেন্দ্রে যামু। সরকার যেই হউক, হামাগেরে মতো কৃষক কষ্ট থেকে মুক্তি পাক।’
এ উপজেলার আরেক কৃষক জালাল উদ্দীন বলেন, ‘ভোট আসে ভোট দেই, কৃষকের কষ্ট থেকেই যায়।’ কালাই হাটে সবজি বিক্রি করতে আসা আরও অনেক কৃষকের সঙ্গে ভোট নিয়ে কথা বলে জানা গেল, এবারের জাতীয় নির্বাচনে যিনিই ক্ষমতায় আসুন, তাঁরা যেন কৃষকদের দুঃখ-কষ্টের কথা ভাবেন। তারা অন্তত এই এলাকার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাঁচাতে একটি হলেও সরকারিভাবে হিমাগার নির্মাণ করেন।’
তার কথাতে একমত পোষণ করে আরেক কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভোট আসলেই প্রার্থীরা অনেক টাকা খরচ করে ভোটারদের খাওয়া-দাওয়া করায়। বর্তমানে গ্রামে গ্রামে খাওয়া-দাওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। আবার উপজেলা, ইউনিয়ন ও পৌরসভার ভোটেও তাই হয়। শুনা যায় নির্বাচনে একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর কম হলেও ৫০ লাখ টাকা হয়, তার চেয়ে এমপি নির্বাচনে এক কোটির বেশী হয়। খরচের টাকা তুলতেই তাদের পাঁচ বছর শ্যাষ হয়। জনগণের কাজ করবে কীভাবে?’
কালাই উপজেলার সড়াইল গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন,
‘যেই দলই সরকার গঠন করুক, হামাগেরে ফসলের ঠিকমতো দাম দেক, ভোট হামরা সেই দলকেই দিমু। হামরা মেম্বার-চেয়ারম্যান বা নেতা হতে চাই না।’
কালাই পৌরসভার কৃষক নাহিদ বলেন, ‘অনেক বছর পর ভোটের মতো ভোট হচ্ছে। ভোটে যে দল জিতবে, সেই দলের কাচে হামরা তেমন কিছুই চাই না। হামরা কষ্ট করে যে আলু-ধান ফলাই সেইটা যেন কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। এতে হামাগেরে উপকার হবে।’





