হবিগঞ্জে ড্যান্ডিতে মজছে পথশিশুদের জীবন
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:২৯ অপরাহ্ণ
১০ বছরের নূরজাহানের বাড়ি হবিগঞ্জ শহরের যশেরআব্দা এলাকায়। খালি পানির বোতল কুড়িয়ে বিক্রয় করে। এই কাজ করে মাসে আয় হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। তবে পুরো টাকাই উড়ে যায় ‘ড্যান্ডি’র পেছনে।
সম্প্রতি হবিগঞ্জ শহরের কালিবাড়ি রোডে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় নূরজাহানের। সময়টা তখন পড়ন্ত বিকেল। কথা বলার ফাঁকে বোতলে মুখ ঢুকিতে ড্যান্ডি সেবন করেছিল নূরজাহান। পাশেই কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথের মেঝেতে বসে ঝিমাচ্ছিল কুটুনী আক্তার নামের আরেক পথশিশু।
নূরজাহান জানায়, কুটুনী তার পাশের বাড়ির। টাউন মসজিদের সামনের মেঝেতে রাকিব ও রফিকুল নামের আরও দুটি ছেলে নিজেদের মাঝে গল্পের ফাঁকে পলিথিনে মুখ ঢুকিয়ে ড্যান্ডি সেবন করছিল।
ঘণ্টাখানেক পরে এই প্রতিবেদক হবিগঞ্জ শহরের পেছনের রোডে মহিলা কলেজ এলাকায় যান। তখন সন্ধ্যা গড়িয়েছে। অন্ধকার, কলেজের গেটের সামনেই দেখা গেল নোংরা পাকা রাস্তায় কাপড় বিছিয়ে মড়ার মতো ঘুমাচ্ছে রাকিব বাদে বাকিরা। কেবল মুখের সামনে একটা বোতল রেখে নিঃশ্বাসের সঙ্গে তখনো ড্যান্ডি সেবন করছিল রফিকুল। আলাপের এক পর্যায়ে সে বলে, ‘দিনে দুইবার ডান্ডি খাই। ডান্ডি খাইলে সবতা (সবকিছু) ভুইল্যা যাইগা।’
পথশিশু আরিফ জানায়, যেখানে লোকজন কম সেখানে বসে ড্যান্ডি খাইতাম, এখন মাঝে মধ্যে খাই। ড্যান্ডি খাইলে মাথা ঘুরে, ক্ষুধা লাগে না। ড্যান্ডিতে ডুবছে পথশিশুদের জীবন
ড্যান্ডি কী:
ড্যান্ডি মূলত একধরনের আঠা। ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যান্ড্রাাইট নামের আঠাটিকেই মাদক সেবীরা ডান্ডি বলে চেনে। এই আঠা দিয়ে নেশা করে তারা। আঠায় থাকা কার্বন-ট্রাই-ক্লোরাইড, টলুইন, অ্যাসিটোন ও বেনজিন স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই বাষ্পে পরিণত হয়। এসব রাসায়নিক শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে মাদকসেবি পথশিশুরা। চিকিৎসকরা জানান, ক্রমশ ব্যবহারের কারণে মাদকটি ধীরে ধীরে চরম আসক্তিতে পরিণত হয়।
হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক দেবাশীষ দাশ বলেন, পথশিশুদের ড্যান্ডি গ্রহণ করার একমাত্র কারণ এটি সস্তা ও সহজলভ্য। পথশিশুরা এটি নাক দিয়ে গ্রহণ করে এবং একধরনের মনস্তাত্তি¡ক অবসাদে চলে যায়। যাকে তারা সমস্ত কিছু থেকে নিস্তার পাওয়া বলে মনে করছে। একই সঙ্গে তারা মনে করে তারা অতীতকে ভুলতে পারছে। অন্য মাদকের চেয়ে ড্যান্ডির পার্থক্য হলো এটি অন্য ধরনের এক অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা আবেগকে ভিন্নভাবে পরিবর্তিত করে। যে কারণে পথশিশুদের মধ্যে এটি জনপ্রিয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে গুরুতর মানসিক সমস্যার পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক জটিলতাও সৃষ্টি হয়।’
ড্যান্ডি কোথায় পাচ্ছে পথশিশুরা:
স¤প্রতি হবিগঞ্জ শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কয়েকজন মাদকাসক্ত পথশিশুর কথা হয়। তারা জানায়, নেশা করার জন্য আঠাটি তারা মুচির কাছ থেকে কিনে নেয়। শহরে এক মুচির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আঠাটি বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও হার্ডওয়্যারের দোকানে বিক্রি হয়। একাধিক হার্ডওয়্যারের দোকানীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ নামের আঠাটি ভারত থেকে আসে। এই আঠা দিয়ে সাধারণত বিভিন্ন ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিকের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, চামড়াসহ বিভিন্ন পণ্য জোড়া দেওয়ার কাজ করা হয়। কৌটায় এবং টিউবে দুইভাবেই বিক্রি করা হয় আঠাটি। টিউবের আঠাটির দাম ৩৫ টাকা। তবে কৌটায় পরিমাণে বেশি থাকায় দামও বেশি হয়।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন হার্ডওয়্যার দোকানি বলেন, টিউবের দাম কম, পরিমাণেও থাকে কম। সে তুলনায় কৌটায় কিনলে লাভ। তাই পথশিশুরা কখনো-কখনো টিউব কিনলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুচি কিংবা ক্ষুদ্র ইলেকট্রিক পণ্য সারাইয়ের দোকানে কৌটা থেকে ৪০-৫০ টাকার আঠা কিনে থাকে।
অসাধু বিক্রেতারা অধিক মুনাফার লোভে পথশিশুদের কাছে এসব নেশা জাতীয় দ্রব্য বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নেশার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে শিশুরা চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও জানা গেছে।
হবিগঞ্জ শহরে তিনকোনা পুকুরপাড় এলাকার লিপি হার্ডওয়্যারের সত্ত্বাধিকারী নৃপেন্দ্র গোপ বলেন, ‘আগে আমরা সবার কাছেই ঢালাওভাবে আটা বিক্রয় করতাম। কিন্তু যখন জানতে পেরেছি পথশিশুরা ড্যান্ডিতে আসক্ত হচ্ছেÑ তখন থেকেই সতর্ক হয়েছি। এখন অপ্রাপ্ত বয়স্কদের হাতে এই আঠা বিক্রয় করি না। কোন লোক আঠা ক্রয় করতে এলে যাচাই বাছাই করে তারপর বিক্রয় করি। মুচিরা আমার নিকট থেকে তিন লিটার পরিমাণের আঠার কৌঠা ক্রয় করেন।’
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, মাদকের তালিকায় এ নেশার নাম না থাকায় সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে খবর পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।




