নস্টালজিয়া আর বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শাহজালাল বাজারের ডমকা
নিজস্ব প্রতিবেদন :
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭:৪৫ অপরাহ্ণ
রমজানের গভীর রাতে সিলেট নগর যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে, ঠিক তখনই হঠাৎ ভেসে ওঠে এক গম্ভীর ধ্বনি। উৎস—সিলেটের ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণ। ভারী ও গভীর সেই শব্দ সিলেটবাসীর কাছে ‘ডমকা’ নামে পরিচিত। এটি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ নয়; বরং শতাব্দীপ্রাচীন এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক।
ডমকা মূলত বড় আকারের নকড়া বা নাকাড়া। তামা বা পিতলের তৈরি বিশাল পাত্রের ওপর শক্ত চামড়া টানিয়ে বানানো হয় এই বাদ্যযন্ত্র। বিশেষ কাঠের মুগুর দিয়ে আঘাত করলে সৃষ্টি হয় ধাতব প্রতিধ্বনিময় গভীর শব্দ, যা একসময় শহর পেরিয়ে আশপাশের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যেত।
ইতিহাসবিদদের মতে, হযরত শাহজালাল–এর সিলেটে আগমনের পর থেকেই মাজারকেন্দ্রিক নানা আচার-অনুষ্ঠানের প্রচলন হয়। তখন সময় জানানোর জন্য ঘড়ি বা মাইকের প্রচলন ছিল না। ফলে শ্রুতিসংকেতই ছিল মানুষের ভরসা। সেই প্রয়োজন থেকেই ডমকা বাজানোর প্রথার সূচনা।
রমজান মাসে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। সেহরির আগে গভীর রাতে এক দফা ডমকা বাজানো হয়, যাতে মানুষ জেগে প্রস্তুতি নিতে পারেন। সেহরির শেষ মুহূর্তে আবার বাজিয়ে সময় শেষ হওয়ার সংকেত দেওয়া হয়। এ ছাড়া দুই ঈদ ও বার্ষিক ওরস শরীফেও ডমকা বাজানো হয়। ফলে এটি শুধু রোজার মাসের নয়, বরং মাজারকেন্দ্রিক সামগ্রিক ধর্মীয় জীবনের অংশ।
প্রযুক্তির বিকাশে এখন মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ঘড়ি ও মসজিদের লাউডস্পিকার মুহূর্তেই সময় জানিয়ে দেয়। তবু ডমকার ধ্বনি থেমে যায়নি।
মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান বলেন, ‘এটি শুধু সময় জানানোর বিষয় নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে। রমজানের শুরু থেকেই অনেকে ডমকার শব্দে ভিন্ন এক অনুভূতি পান—যা তাঁদের কাছে ঐতিহ্যের স্মারক।’
বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে ডমকা নস্টালজিয়ার অংশ। তাঁদের স্মৃতিতে আছে শৈশবের সেই সময়, যখন ডমকার শব্দেই সেহরির জন্য জেগে উঠতেন। আলো-ঝলমলে শহর আর প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমানের ভিড়েও তাই ডমকা যেন অতীতের সেতুবন্ধন।
রমজানের রাতে মাজার প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে প্রতিটি আঘাতে যেন ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া ঐতিহ্য হারায় না। সিলেটের আধ্যাত্মিক পরিচয়ের সঙ্গে ডমকার এই প্রথা তাই আজও এক ‘জীবন্ত প্রতীক’।





