শহরের চাকা থামলে,ক্ষুধার চাকা থামে
দেবব্রত রায় দিপন
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ নভেম্বর ২০২৫, ২:০৭ অপরাহ্ণ
সিলেটের রাস্তায় এখন আর শুধু হর্ণের শব্দ নেই, আছে অসহায় দীর্ঘশ্বাস। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ব্যাটারি চালিত রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত যেন পুরো শহরের শ্রমজীবী মানুষের বুকের ভেতর গভীর দাগ কেটে দিল। এ শহরের সকাল যেমন রিকশার ঘণ্টায় ওপরে ওঠা, তেমন রাতও নামত ঘরের উঠোনে খাবারের আনন্দে। আজ সেই হাসি ম্লান, চোখে আতঙ্ক, হাতে শূন্যতা। কেউ কেউ বলে, রিকশাগুলো নাকি শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে। কিন্তু ক্ষুধার্ত শিশুর চোখজোড়া কি কোনোদিন শহর সাজানোর আলোকে হার মেনেছে? যে রিকশা চালকরা ভোরের কুয়াশা ঠেলে বের হন, রোদ-বৃষ্টি গায়ে মেখে ঘরে ফেরেন, তাদের ঘাম কি শহরের সৌন্দর্যের অংশ নয়?
ব্যাটারি চালিত রিকশা অবৈধ, এমন যুক্তি তোলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন তখনই আসে: অবৈধ যদি হয়, তাহলে কারখানা হলো কীভাবে? খোলা বাজারে বিক্রি হলো কেন? চার্জিং স্টেশনে সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগ থাকল কী করে? ত্রুটি যদি থাকে, তা কি শ্রমিকদের নয়, ব্যবস্থার? আর সেই ত্রুটির পাপভাগ কেন ঢেকে দিতে হবে দিন আনে দিন খাওয়া মানুষের গায়ে?
শহরের বিদ্যুৎ নষ্ট হয় রিকশার ব্যাটারিতে, কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরগুলোতেই বিদ্যুতের দাপট বেশি। সেখানে প্রশ্ন ওঠে না, শাস্তির মাইক বাজে না।
বেশি বিদ্যুৎ খরচ যদি অপরাধ হয়, তাহলে কি শ্রমিকের ব্যাটারি আগে, নাকি ক্ষমতার শীতল ঘর? বলা হয় ব্যাটারি রিকশায় দুর্ঘটনা বেশি। অথচ পরিসংখ্যানে তারা দায়ী নগণ্য মাত্রায়। তবু তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির কাঠগড়ায় তোলা হয়, আর বড় গাড়ির বেপরোয়া গতিকে ঘোমটা পরিয়ে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ শহরের রাস্তায় তাই বিচারও এখন ক্ষমতার গতি মাপে হয়।
আর সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিযোগ: “রিকশাচালকদের বেশিরভাগই বহিরাগত” এই কথাটির অমানবিকতা হৃদয় কাঁপায়। কাজ করে খাওয়া মানুষ কি কখনও বহিরাগত হয়? রুটি রোজগারের নামে কি মানুষকে পরিচয়ের প্রশ্নে সাজা দেওয়া যায়? একটা শহর যদি শ্রমিককে গ্রহণ করতে না পারে, তবে সেই শহরের সমৃদ্ধি কি সত্যিই নিজের?
শ্রমিকদের গ্রেপ্তার, ভয় দেখানো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া… এগুলো শুধু আইন প্রয়োগ নয়, এক ধরনের হৃদয়হীনতার প্রদর্শনী। যে মানুষদের ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে শহর চলে, তাদের কণ্ঠরোধ করা মানে শহরের বিবেককেই বন্দি করা। সমাধান, আছে। ইচ্ছা, থাকলেই যথেষ্ট। রিকশাগুলোকে মানসম্পন্ন করে চালু রাখা যায়,লাইসেন্স দেওয়া যায়,প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়,আর পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন বানানো যায়। তাহলেই শহরও চলবে, মানুষও বাঁচবে।
উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বড় করা নয়, মানুষের মনও বড় করা।আজ যারা রিকশা থেকে নামতে বাধ্য, তাদের জীবনে নেমেছে ক্ষুধার ঝড়। তাদের শিশুর কান্না, স্ত্রীর অপেক্ষা, বৃদ্ধ মায়ের ওষুধের প্রয়োজন…এসবের কোনো বিকল্প প্রশাসনিক নোটিশে লেখা থাকে না।
শহর যদি সত্যিই আলোকিত হতে চায়, তবে আলো পৌঁছাতে হবে শ্রমিকের ঘরেও। কারণ উন্নয়নের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোও ম্লান হয়ে যায় যখন কোনো মায়ের চুলে ক্ষুধার বাতির ছায়া পড়ে।
সিলেট চাই সুন্দর হোক, পরিচ্ছন্ন হোক। কিন্তু তার আগে চাই মানুষ সুন্দর থাকুক, জীবিকা পরিচ্ছন্ন থাকুক, শ্রমিক মর্যাদা পাক। কারণ শহর তার শ্রমিককে ত্যাগ করে যতটা বড় হয়, তার মানবিকতাকে হারিয়ে ততটাই ছোট হয়ে যায়।
ব্যাটারি চালিত রিকশা বন্ধ করা নিয়ে বর্তমানে সিলেটে যা ঘটছে, তা রীতিমতো ফ্যাসিজমকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনের শুরুটা হয় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। ব্যাটারি চালিত রিক্সাগুলো সিলেট যানজটের অন্যতম কারন-এমন অলিক যুক্তি দেখিয়ে মূলত রিক্সা বন্ধে প্রথম আওয়াজ তোলেন সাবেক সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি ফুটপাতে হকার উচ্ছেদ এবং ব্যাটারি চালিত রিক্সা বন্ধে জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ কমিশনারের সহযোগীতা কামনা করেন। এরপর ঘোষণা দিয়ে নগরীতে বন্ধ করা হয় ব্যাটারি চালিত রিক্সা। বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না করে ব্যাটারি চালিত রিক্সা বন্ধ করার এই সিদ্বান্তকে অযৌক্তিক ও বেআইনী উল্লেখ করে বামপন্থী সংগঠনগুলো এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। একই সাথে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না করে এই সিদ্ধান্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবীকায় বড় আঘাত বলে উল্লেখ করা হয়। জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ কমিশনারের এই সিদ্বান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবিতে বামপন্থীদের কয়েকটি সংগঠন কর্মসূচী হাতে নেয়। এই কর্মসূচীতে ব্যাটারিচালিত রিক্সা চালকেরা স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশ গ্রহণ করে। এর পর পরই শুরু হয় আন্দোলনকারী নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার।
গ্রেপ্তারের প্রথম শিকার হন বাসদ সিলেট জেলার আহ্বায়ক আবু জাফর ও সদস্য সচিব প্রণব জ্যোতি পাল। ২৮ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয় থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় একমাস কারাভোগ শেষে ২৮ অক্টোবর এই দুই নেতা জামিনে মুক্তি লাভ করেন। এর আগে আটক হওয়া ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের নেতা সৈকত ও রনি ১৯ অক্টোবর জামিনে মুক্ত হন। এর পর ৩১ অক্টোবর আটক করা হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সিলেট জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমনকে। ১ নভেম্বর বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সিলেট কার্যালয় থেকে আটক করা হয় আরও ২২ নেতাকর্মী। ৪ নভেম্বর সিলেট নগরীর চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আটক করা হয় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট জেলা সংসদের সভাপতি মাশরুখ জলিল এবং শাবিপ্রবির সংগঠক মো. জুবায়ের আহমেদ জুয়েল ও শান্ত তালুকদার।
শ্রমজীবী মানুষের ঘাম আর পরিশ্রমে এই শহর দাঁড়িয়ে আছে। যারা ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই রাস্তায় নামে, দিনের শেষে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটাতে জীবনটা ঝুঁকির মাঝে রাখে, তাদের দমিয়ে রেখে কোনো শহর কখনো উন্নতি পায়নি, কোনো সময়েই পাবে না। শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠরোধ করে, তাদের গ্রেপ্তার করে কিংবা ভয় দেখিয়ে মানবিক দাবি ঠেকানো যাবে না। ইতিহাসও তা বলে, মানুষের জীবিকার প্রশ্নে শক্তির অপব্যবহার অবশেষে ব্যর্থই হয়।
বাংলাদেশের কোনো মেট্রোপলিটন এলাকায় ব্যাটারি চালিত রিকশা নিষিদ্ধ নয়। পরিচ্ছন্ন শহর রাজশাহীতেও নেই প্যাডেল রিকশা, সেখানে ব্যাটারি চালিত বাহনই মানুষের ভরসা। তাহলে সিলেটে কেন এই বৈষম্য? কেন হাজারো পরিবারকে হঠাৎ করে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হবে? এই শহর কি শুধু কাগজের হিসাবের জন্য, না কি মানুষের জীবনের জন্য?
সিলেটকে উন্নতির পথে রাখতে হলে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। শ্রমিকরা যদি বাঁচে, শহর বাঁচবে; যদি তারা পড়ে যায়, পুরো নগরই থমকে যাবে। তাই মানবিকতার জায়গা থেকেই বলছি: সমস্ত গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকনেতা,রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিকদের দ্রুত মুক্তি দিন। তাদের ঘরে যেন আবার আগুন জ্বলে, বাচ্চারা যেন আবার স্কুলে যেতে পারে, মায়েরা যেন নিশ্চিন্তে স্বামী-সন্তানের অপেক্ষায় থাকতে পারে।
আসুন, সংকট নয়, সমাধানের পথে হাঁটি। সিলেটকে আমরা সবাই মিলে ভালোবাসি, তাই সিলেট গঠনে আমাদের ঐক্যমত হোক মানবতার ভিত্তিতে।




