শাহ আরেফিন টিলা : ১৩ একর টিলাভূমিতে ১৩ শতক টিলাও নেই
নীরব চাকলাদার
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:১৫ অপরাহ্ণ
টিলাভূমির ১৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ছিল শাহ আরেফিন টিলা। যাকে কেন্দ্র করে এই স্থানের পরিচয় ঘটে তিনি হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)। প্রচলিত মতে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)আরব বা মধ্য এশিয়া অঞ্চল থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে আগমন করেন। সেই সময় বহু সুফি দরবেশের মতো তিনিও বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে দাওয়াত দিতেন। কোম্পানীগঞ্জে আগমণের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে তাঁর প্রথম পদচারণা ঘটে। ধারণা করা হয়, হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও তার সঙ্গীদের আগমনের পর সিলেট অঞ্চল সুফি সাধকদের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে একটি টিলার উপর নির্জন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। প্রাকৃতিক নির্জনতা ও শান্ত পরিবেশ তার আত্মশুদ্ধির সাধনার জন্য উপযোগী ছিল বলে তিনি সেখানে একটি খানকাহ বা আস্তানা স্থাপন করেন। এখন সেই আস্তানা নেই। নেই শাহ আরেফিনের স্মৃতিচিহ্নও। আস্তানা সংলগ্ন মসজিদটিও বিলীনের পথে। টিলাভূমির স্থলে পুরো এলাকা এখন কেবল গর্ত আর গর্ত। প্রকৃতির রাজ্যে কিছু মানুষের দানবীয় তান্ডব যজ্ঞে যে কারো গা শিউরে উঠবে। তবুও থামেনি ধ্বংশলীলা। বরং যে টিলাভূমি বিলীন হয়েছে গর্তে, সেখানেই শাহ আরেফিনের নামে চলে চাদাঁবাজি।
চাদাঁবাজির জন্য শাহ আরেফিনের নাম করে শাহ আরেফিন শাহ (র.) এর মাজারের কমিটিও রয়েছে। যথারীতি এই মাজারের খাদেমও রয়েছে। শাহ আরেফিনের স্থাপনা কিংবা মাজার কোনটাই না থাকলেও মাজারের নাম করে চাঁদাবাজি চলছে প্রায় এক যুগ ধরে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাধীন পশ্চিম ইসলাম পুর ইউনিয়নের ঝালিয়ার পাড় গ্রামে রয়েছে শাহ আরেফিন টিলার অবস্থান। কথিত রয়েছে-এই টিলার উপর উঠে তিনি সেখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তারপর থেকে স্থানটি শাহ আরেফিন টিলা নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু ১৩ একর জায়গা বিস্তুৃত এই টিলাভূমি থেকে নির্বিবাধে চলে বালু-পাথর লুট। ফলে ধীরে ধীরে ধ্বসে পড়ে টিলা ভূমি। বিলিন হতে থাকে টিলার বিরাট অংশ। কিছুটা অস্তিত্ব টিকে থাকলেও চব্বিশের ৫ আগষ্ট পরবর্তী পুরো টিলাভূমি বিলিন হয়ে যায়। ফলে শাহ আরেফিনের স্মৃতিচিহ্ন বা স্থাপনার কোন অস্তিত্বই এখন আর খোঁজে পাওয়া যাবে না। সংলগ্ন মসজিদটিও ধীরে ধীরে গর্তে বিলিন হবার পথে। মসজিদ আছে। কমিটিও আছে। তবে টিলা ধ্বংশ দৃশ্যে ভয়ে সেই মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন না মুসল্লীরা।
যাদের হাত ধরে মসজিদ এবং শাহ আরেফিন শাহের স্মৃতি বিজড়িত বিশাল টিলাভূমি ধ্বংশ হচ্ছে-তাদের বিরুদ্ধে মসজিদ কিংবা মাজার কমিটির কোনো অভিযোগ নেই। প্রতি সপ্তাহান্তে ৪০ হাজার টাকার চুক্তিতে দিনে-রাতে চলছে বালু-পাথর লুট। লুটপাট যজ্ঞে একসময় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয়দের নাম থাকলেও দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দৃশ্যপটে এখন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠন। তাদের সাথে মিত্র হিসেবে রয়েছেন সাবেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠনের সহযোগীরা।
মাজারের সর্বশেষ খাদেমের নাম আনোয়ার হোসেন আনাই। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাথর লুট চক্রের কবলে টিলাভূমি যখন বিলীনের পথে, তখন স্থানীয় এলাকাবাসী শাহ আরেফিনের স্মৃতি রক্ষায় ২০১৯ সালের শেষের দিকে আমাকে মাজারের খাদেম হিসেবে নিযুক্ত করেন। আমি ২০২২ সালের শুরুর দিকে টিলাভূমি ধ্বংশপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি। এর পর থেকে আর কোনো কমিটি না থাকায় ধীরে ধীরে মাজারটি একেবারেই গর্তে বিলিন হয়ে পড়ে। ফলে টিলাভূমির বিশাল এলাকা এখন এক একটি বিশাল গর্তে রূপ নিয়েছে। তবে মাজারের নাম করে ২০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, এটি বিরুদ্ধ কোন একটি পক্ষের অপপ্রচার হতে পারে।
ঝালিয়ার পাড় নিবাসী সাবেক ইউপি সদস্য সানুর আলী জানান, মূলত সরকারি লিজ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বশির অ্যান্ড কোম্পানীর হাত ধরে শুরু হয় টিলাভূমি ধ্বংশযজ্ঞ। তারপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বন্ধ হয় টিলা কাটা। তবে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক চত্রছায়ায় এখনও তান্ডব চলে দিনে-রাতে। এখনকার দৃশ্যের সাথে ১৩ একর বিস্তৃত বিশাল টিলাভূমির সাদৃশ্য মেলাতে গেলে-জন্ম নিবে শুধুই প্রশ্ন আর প্রশ্ন। টিলাভূমি ধ্বংশযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছেন মাজারের বিগত খাদেমরা। এমন তথ্য জানিয়ে স্থানীয়রা জানান, ঝালিয়ার পাড় নিবাসী মৃত ফকির আবদুল মনাফ ছিলেন শাহ আরেফিন মাজারের খাদেম। পরবর্তীতে তাঁর মেয়ে মৃত জাহানারা বেগম দুই মেয়াদে মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। জাহানার বেগমের পর তারই ছেলে মনির মিয়াও খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের হাত ধরেই মূলত বিস্তৃত টিলাভূমি থেকে বালু-পাথর লুট করা হয় বিরামহীন ভাবে। বিচ্ছিন্নভাবে আরও যাদের নাম পাওয়া গেছে-তারা হলেন,উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক বাবুল মিয়া,আওয়ামী লীগ নেতা কালা মিয়া,আবদুর রহিম।
এদিকে শাহ আরেফিন সংলগ্ন ছনবাড়ি সোনাই নদী থেকে চলে বালু উত্তোলন। উত্তোলিত বালু ট্রাক্টরযোগে পাচার হলে সেখানেও চলে গাড়ি প্রতি একশো থেকে দেড়শো টাকা চাঁদাবাজি। এভাবে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশো বালুবাহী ট্রাক্টর থেকে টাকা আদায় করেন উপজেলা যুবদল নেতা সোনা মিয়া এবং আনা মিয়ার লোকজন। আবার স্থানীয় আজির মেম্বারের বাড়ি থেকে পাথরবাহী গাড়ি থেকে একশো থেকে দেড়শো টাকা করে চাঁদা আদায় করেন মানিক ও সোনা মিয়ার লোকজন।
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রশ্ন—একজন সুফি সাধকের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ধ্বংস হয়ে গেলেও কেন কেউ দায় নিচ্ছে না।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, সত্যিকার অর্থে-এই এলাকার সকলেই কোন না কোন ভাবে চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। যেমন কারো বাড়ির সামনে টিলা কাটা হচ্ছে, কারো বাড়ির রাস্তা দিয়ে বালু-পাথরবাহী ট্রাক যাচ্ছে,আবার কেউবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। এদের সকলে যদি সুযোগ না দিতো-তাহলে প্রকৃতির এই স্বর্গরাজ্য আজ বিরানভূমিতে পরিণত হতো না। তিনি বলেন. অভিযোগ থাকলেও যাতাযাত ব্যবস্থার কারণে সেখানে সব সময় অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। আবার অভিযান চলাকালে সাময়িক বন্ধ হলেও রাতের আঁধারে ফের লুটপাট চলে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান বলেন, এড়িয়াটি মূলত খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। সুতরাং থানা প্রশাসন এককভাবে এখানে কিছুই করতে পারে না। তবে সমন্বিত উদ্যো্গ গ্রহণ করা হলে অবশ্যই থানা পুলিশ সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই মন্ত্রণালয় কিংবা তাঁর প্রতিনিধিগন এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।




