তাহিরপুরে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া মদের বোতলে রক্তাক্ত হচ্ছেন কৃষকেরা
তাহিরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:০২ অপরাহ্ণ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাওরের মাঠে বোরো ধান রোপণ করতে গিয়ে রক্ত ঝরছে কৃষকের। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া মদ ও বিয়ারের ভাঙা বোতলের কাচ এখন তাঁদের জন্য নীরব মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। হাওরের পানির নিচে লুকিয়ে থাকা এসব কাচের টুকরোতে কেটে চলতি বোরো মৌসুমেই অর্ধশতাধিক কৃষক আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বর্ষা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ তাহিরপুরের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় হয়। হাউজবোট ও নৌভ্রমণের সময় অনেক পর্যটক মদ ও বিয়ার পান করে খালি বোতল হাওরের পানিতে ফেলে দেন। বর্ষা শেষে পানি নেমে গেলে শুরু হয় বোরো চাষ। তখন পাওয়ার ট্রিলারের লাঙ্গলে এসব বোতল ভেঙে কাদা ও পানির নিচে ছড়িয়ে পড়ে। খালি চোখে দেখা না যাওয়ায় জমিতে চারা রোপণ কিংবা নিড়ানি দেওয়ার সময় হঠাৎ করেই কৃষকদের হাত-পা কেটে যায়।
মাটিয়ান হাওর, বলদা হাওর, শমসার হাওর ও ট্যাকেরঘাট হাওরসহ অন্তত পাঁচ-ছয়টি হাওরে কাজ করতে গিয়ে ফজলুল বারি, ফইজুন নুর, বশির মিয়া, হালিম মিয়া, জুয়েল মিয়া, আলিম মিয়া ও রইস মিয়াসহ অর্ধশতাধিক কৃষক আহত হয়েছেন। দিনমজুর ও প্রান্তিক এসব কৃষক আহত হয়ে কাজে নামতে না পারায় পরিবার নিয়ে পড়েছেন চরম আর্থিক সংকটে।
বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জুয়েল মিয়া বলেন, ‘আমার গ্রামেই ১০ জনের বেশি কৃষক কাচে পা কেটে আহত হয়েছেন। পর্যটকদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আমাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এমন চলতে থাকলে হাওর পথে পর্যটকদের চলাচল বন্ধ করার দাবি জানাতে হবে।’
তাহিরপুর নৌ-মালিক সমিতির সভাপতি রব্বানি মিয়া বলেন, অনেক কৃষক এখন কাচের ভয়ে জমিতে নামতেই সাহস পাচ্ছেন না। আগামী বর্ষা মৌসুমে বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
মেঘদূত হাউজবোটের মালিক নিশো দাস ঘটনাটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, তাঁরা পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকার চেষ্টা করেন। কান্ট্রি ট্যুরিজম বাংলাদেশ (ঢাকা)-এর স্বত্বাধিকারী রাসেল ভূঁইয়া বলেন, ‘ভ্রমণের আনন্দ যেন কৃষক ও পরিবেশের সর্বনাশ না ডেকে আনে। পর্যটকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের আহত হওয়ার খবর তিনি পেয়েছেন। পর্যটকদের এমন আচরণ অব্যাহত থাকলে হাওরের কৃষি পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। নিরাপদ কৃষির স্বার্থে হাওর ভ্রমণে আসা সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, হাওরের পরিবেশ রক্ষা ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন—নইলে কৃষকের ঘামে ফলানো ধানক্ষেতই হয়ে উঠবে রক্ত ঝরার মাঠ।




