মৌলভীবাজারে হিমাগার না থাকায় নষ্ট হচ্ছে বিপুল খাদ্যশস্য
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭:০৮ অপরাহ্ণ
নানা ধরনের ফলমূল ও মৌসুমি সবজির জন্য মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার পরিচিতি দেশজুড়ে। এ দুই উপজেলায় হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) না থাকায় প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার মৌসুমি ফল ও সবজি।
এ দুই উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় কৃষকেরা অতিকষ্টে বিভিন্ন তরিতরকারি ও ফলমূল উৎপাদন করছেন। কিন্তু মজুত করে রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কম মূল্যে এসব কৃষি পণ্য বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষকদের ভাষ্যে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় হিমাগার স্থাপন করা হলে তারা তাদের উৎপাদিত মৌসুমি সবজি ও ফল সেখানে রাখতে পারবেন। এতে তারা এসব পণ্যের ন্যায্য মূল্য যেমন পাবেন তেমনি বিপুল পরিমাণ সবজি ও ফল নষ্ট হওয়ার হাত থেকেও রক্ষা পাবেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কৃষিনির্ভর কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল অন্যতম উপজেলায় প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ আলু, টমেটো, করলা, সিম, শসা, আনার, লেবুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল-ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন এ দুই উপজেলায় হিমাগার স্থাপিত না হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় স্থানীয় কৃষকরা। বারবার আশ্বাস আর ফাইলবন্দী প্রস্তানার মাঝেই আটকে আছে কৃষকদের এই প্রাণের দাবি। ফলে পচে নষ্ট হচ্ছে কষ্টার্জিত ফসল।
কমলঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আদমপুর, মাধবপুর, আলীনগর, ইসলামপুর, মুন্সীবাজার, পতনঊষার, কমলগঞ্জ সদর, রহিমপুর ইউনিয়নসহ পৌরসভায় বিপুল পরিমাণ সবজি চাষ হয়। তবে হিমাগার না থাকায় ফসল তোলার মৌসুমে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। বাধ্য হয়ে কম দামে সবজি বিক্রি করতে হয়, নতুবা সংরক্ষণের অভাবে মাঠেই পচে যায় টন টন ফসল। কৃষকদের অভিযোগ, সংরক্ষণের সুবিধা থাকলে তারা অফ-সিজনে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত বিভিন্ন সময়ে সরকারি পর্যায়ে হিমাগার নির্মাণের জন্য জায়গা নির্বাচন ও প্রাথমিক প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেই ফাইল আর আলোর মুখ দেখেনি। কৃষকদের দাবির মুখে মাঝে মধ্যে আশার বাণী শোনানো হলেও বাস্তবে এর কোনো অগ্রগতি নেই।
টমোটো চাষি আব্দুল মতিন জানায়, আমরা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলাই, কিন্তু রাখার জায়গা নেই বলে পানির দরে বিক্রি করতে হয়। একটা কোল্ড স্টোরেজ হলে আমাদের আর ঋণের জালে জড়াতে হতো না। ফসল মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে যায়। হিমাগারে রাখতে পারলে পরে লাভজনক দামে বিক্রি সম্ভব।’
স্থানীয় আলু চাষিদের বীজের জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। হিমাগার থাকলে তারা নিজেদের বীজ নিজেই সংরক্ষণ করতে পারতেন। হিমাগার থাকলে কৃষকরা বড় পরিসরে চাষাবাদে আগ্রহী হবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।
স্থানীয় কৃষকরা জানায়, ‘চায়ের রাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চা এবং লেবুর পরেই রয়েছে আনারসের চাষ। জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সারা বছরই কমবেশি আনারস পৌঁছে যায়। কিন্তু সবজি ও আনারস- লেবু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পঁচে নষ্ট হয়। অধিকাংশ সময় পঁচনশীল কৃষি পণ্য পচে যাওয়ার শঙ্কায় কৃষকদের নাম মাত্র মূল্যে অনেক সময় এসব পণ্য বিক্রি করে দিতে হয়। তাই আনারস সংরক্ষণের জন্য একটি হিমাগারের খুব জরুরি।’
জানতে চাইলে কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, ‘কমলগঞ্জ উপজেলায় টমেটোসহ বিভিন্ন শাক-সবজি উৎপাদন হয়। টমেটোসহ শাক-সবজি পচনশীল হওয়ার হিমাগার অতীব জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে- এটি এখন প্রক্রিয়াধীন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানায়, ‘হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবগত করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
একই চিত্র জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলারও। এখানেও হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) না থাকায় সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকেরা জানায়, ‘হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য মধ্যস্বত্বভোগী লোকজনের কাছে বাধ্য হয়েই অল্প দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘অনেক কৃষক আমাদের কাছে অভিযোগ করেন যে, সবজিসহ আনারস পঁচে নষ্ট হয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এসব কৃষি পণ্য সংরক্ষণের জন্য শ্রীমঙ্গলে একটি হিমাগার স্থাপন জরুরি। কৃষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে শ্রীমঙ্গলে একটি হিমাগার স্থাপনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।’





