গোয়াইনঘাটের ইউএনও'র ১ হাজার পাঞ্জাবী উপহার : নানা সমালোচনা | Sylhet i News
মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন



নিজস্ব প্রতিবেদন ::

প্রকাশ ২০২২-০৫-১২ ১৫:৩২:৪৫
গোয়াইনঘাটের ইউএনও'র ১ হাজার পাঞ্জাবী উপহার : নানা সমালোচনা

গোয়াইনঘাটের ইউএনও তাহমিলুর রহমান। বিসিএস ৩৩ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর পর্যটন কন্যা সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় যোগ দেন তিনি। তারপর আর পিছু ফিরে থাকাতে হয়নি। পর্যটন খাত থেকে আসা লাখ লাখ টাকা সাবাড় করে এখন তিনি বেশ আলোচনায় । পর্যটন স্পটে স্বেচ্ছসেবক নিয়োগ দিচ্ছেন নিজের পছন্দের লোকদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে গত ৪ মে টিকিট ফি’কে কেন্দ্র করে জাফলংয়ে পর্যটকদের উপর হামলার পর এই ইউএনওর ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সচেতন মানুষজন। কেউ কেউ নিজেদের প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, দেশের অন্য কোথাও উন্মুক্ত স্থানে রশিদের মাধ্যমে টাকা আদায় করা না হলেও জাফলংয়ে চাঁদাবাজির আশ্রয় নিয়েছে প্রশাসন।

এদিকে, জাফলং কাণ্ডে সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতে এবার নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। গেল ঈদ উল ফিতরে ১ হাজার পাঞ্জাবী বিতরণ করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন ইউএনও তাহমিলুর রহমান। গত ঈদ উল ফিতরে, উপজেলা প্রশাসন, সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সচিব, বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা কর্মী ও ইউএন ‘র শুভাকাঙ্ক্ষী কতিপয় সাংবাদিকদের আড়ং ব্রান্ডের বেশ কিছু পাঞ্জাবী উপহার দেন তিনি। এদের মধ্যে পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া হেলাল ইউএনও কর্তৃক প্রেরিত পাঞ্জাবী গ্রহণ না করে আমেরিকায় চলে যান। একইভাবে পাঞ্জাবী ফিরিয়ে দিয়েছেন ডৌবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যেতম নেতা এম নিজাম উদ্দীন।

তথ্য নিশ্চিত করে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ইউএনও অফিসের ৩য় শ্রেণীর একজন কর্মচারী জানান, ‘ইউএনও স্যার গত ঈদে ১ হাজার পাঞ্জাবী বিতরণ করেন। পাঞ্জাবীগুলো প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সচিব, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগসহ শুভাকাঙ্খীদের কাছে নিজেই পৌছে দেন তিনি।’

এদিকে জাফলং কাÐের পর ইউএনও’র এই ঘটনা নিয়ে এখন সোস্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই ঘটনার পর ইউএনও এর বার্ষিক আয় সম্পর্কে এবং উপহার বিতরণের টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তাদের মতে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে তিনি সবাইকে আড়ং ব্রান্ডের দামী পাঞ্জাবী উপহার দেবেন-তাঁর আগে উনার টাকার আয়ের উৎস প্রকাশ করা উচিত।

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ায় জৈন্তিয়া কেন্দ্রীয় ছাত্রপরিষদের পরিষদের সভাপতি মাহফুজুল কিবরিয়া ফেইসবুক টাইম লাইনে লিখেন ‘ইউএনওর আয়ের উৎস কি, তা খতিয়ে দেখা দরকার’।

সংবাদকর্মী কাওসার আহমদ রাহাত তাঁর টাইম লাইনে লিখেন ‘ম্যানেজ কাহাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কি কি তা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান’ গেল ঈদুল ফিতরে ঈদ উপঢৌকন’ হিসেবে এক হাজার পাঞ্জাবী বিতরণ করলেন গোয়াইনঘাটের ইউএনও- উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদের ১২ জন চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা, উপজেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা ও পর্যটন স্পট জাফলং, বিছনাকান্দি ও রাতারগুলে তার নিয়োজিত লাঠিয়াল ও কিছু দালালদের মাঝে প্রায় ১ হাজার পাঞ্জাবী বিতরণ করেছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ‘ঈদ উপঢৌকন’ লেখা সম্বলিত প্যাকেটটি বিতরণ করেন তিনি নিজেই। তবে শ্রেণিবিদ্বেষ অনুযায়ী কয়েকজনকে তার সিএ ফোন করে উপহার নেয়ার অনুরোধ করেন। তবে ইউএনও’ র এই উপহার প্রত্যাখান করে তা ফিরিয়ে দিয়েছেন একজন আওয়ামী লীগ নেতা ও ২ জন ইউপি চেয়ারম্যান।

সবাইকে ম্যানেজ করতে লাল কালারের আড়ং ব্র্যান্ডের এই এক হাজার পাঞ্জাবী রমজানের মাঝামাঝি সময়ে অর্ডার করেন বিতর্কিত এই ইউএনও। ২৫ রমজান সিলেটের আড়ং থেকে তার সিএ, গাড়ি ড্রাইভার এই পাঞ্জাবী সংগ্রহ করেন। ৩,৬৪৯/= টাকা দামের প্রতিটি পাঞ্জাবী আকর্ষণীয় ও কারুকাজ সম্বলিত বলে জানিয়েছেন আড়ংয়ের একজন কর্মকর্তা।

সোস্যাল মিডিয়ার নেটিজেনরা সমালোচনা করে বলেন, উপহার দেয়া দোষের কিছু নয়, তবে প্রশ্ন হচ্ছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাসিক সেলারি কত?? ১০ লাখ টাকা যদি মাসিক সেলারি হয়, তবে ৩/৪ লাখ টাকা খরচ করে উপহার দিতেই পারেন তিনি !!! আর যদি তা না হয় তবে, কোন খাত থেকে তিনি এই টাকা পেলেন তার হিসেব জানারও অধিকার উপজেলার জনগণের আছে।’
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক শাহাবুদ্দিন শিহাব তার টাইম লাইনে লিখেন -‘ম্যানেজ কাহাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কি কি তা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান!
গেল ঈদুল ফিতরে উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদের ১২ জন চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা, উপজেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা ও পর্যটন স্পট জাফলং, বিছনাকান্দি ও রাতারগুলে তার নিয়োজিত লাঠিয়াল ও কিছু দালালদের মাঝে প্রায় ১ হাজার পাঞ্জাবী বিতরণ করেছেন।

সাংবাদিক মইনুল হক বুলবুল তার টাইম লাইনে লিখেন-‘পর্যটন উন্নয়ন তহবিল নামে সোনালী ব্যাংক গোয়াইনঘাট শাখায় গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)’র যৌথ স্বাক্ষরযুক্ত এই একাউন্টে (৫৬১৪৩০২০০০৯০৫) এখন আছে মাত্র ৫৬ হাজার টাকা!!! অথচ বিগত ৯ মাসে শুধুমাত্র জাফলং থেকেই ১০ টাকার টোকেন বাবদ আদায় করা হয়েছে কোটি টাকার উপরে। তবে এনআরবি ব্যাংক জাফলং শাখায় আরো একটি একাউন্ট রয়েছে। ঐ একাউন্টের বিষয়ে কোন তথ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়া কাউকেই দেয়া হচ্ছে না। তবে ঐ একাউন্টে গত কয়েকদিনে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে জানিয়েছে একটি বিশ্বস্থ সুত্র। এদিকে সোনালী ব্যাংক গোয়াইনঘাট শাখার একাউন্ট থেকেও গত কয়েক মাসে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।”

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক পাঞ্জাবী উপহার বিষয়ে সিলেট বারের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট লিয়াকত আলী বলেন, ‘ইউএন ও সাহেব হয়ত বা জাকাত হিসেবে সবাইকে পাঞ্জাবী দিয়েছেন। এটা তিনি ব্যাক্তিগতভাবে করতেই পারেন। তবে যদি রাষ্ট্রীয় অর্থ কিংবা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে করেন, এটা অনৈতিক এবং বেআইনী’।

এই ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পশ্চিম আলীর গাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া হেলাল বলেন ‘গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন দুর্নীতিবাজ অফিসার। তিনি পাঞ্জাবী উপহার দিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করতে চান।কিন্তু আমি এই অন্যায় মেনে নিতে পারিনা।’

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নাম্বারে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।


এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে সিলেটের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমানকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।

এনসি

ফেসবুক পেইজ