বিসিকের শিল্প বর্জ্যে বিনষ্ট খাদিম এলাকার পরিবেশ | Sylhet i News
মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন



নীরব চাকলাদার

প্রকাশ ২০২২-০৫-১২ ১৬:১৩:০১
বিসিকের শিল্প বর্জ্যে বিনষ্ট খাদিম এলাকার পরিবেশ

সিলেট শহরতলীর খাদিমপাড়াস্থ বিসিকের শিল্পকারখানার বর্জ্যে বালুটিকর খালের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। শিল্প বর্জ্যে দূষিত খালের পানি আলকাতরার মতো কালো রং ধারণ করেছে। বিষাক্ত কেমিকেলে পানি থেকে মাছ ও জলজ প্রাণি অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। সেই সাথে দূষিত পানির বিদ্ঘুটে-বিকট দুর্গন্ধে বালুটিকরসহ আশপাশ এলাকার মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। পানি এতোটাই দূষিত যে ক্ষেতের ফসল পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অনেক আবেদন-নিবেদন, অনুনয়-বিনয় করেও কোন কাজ না হওয়ায় তারা প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ও বিসিক সিলেটের উপ-মহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।


জানা যায়, খাদিমের উত্তরাংশের খাদিম চা বাগান ও বুড়জান চা বাগানের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা লালিছড়া খাদিম বিসিকের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিলেট তামাবিল সড়কের মুচিয়াবাড়ি পুল হয়ে নামধারণ করেছে নীলবাড়ি ছড়া। পরে দাশপাড়া, কল্লগ্রাম, বালুটিকরসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বালুটিকরের খাল নামে মাকুলি-হাকুলি বিলে গিয়ে কুশিগাঙ এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে। কুশিগাঙ পরে কুশিঘাট হয়ে সুরমা নদীতে মিশেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলকাতরার মতো কালো হয়ে আছে খালের পানি। যেখানেই পানি প্রবাহ একটু আটকা পড়ে সেখানেই সাদা ফেনার মতো আস্তরন তৈরি হয়। স্থানীয়দের নিকট বিষয়টি জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আগে বাড়েন। পরে বলছি। আরেকটু আগানোর পরে নাকে লাগলো এক বিদ্ঘুটে-বিকট দুর্গন্ধ। দ্রুত সরে এসে রক্ষা পাওয়া গেছে।’ স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টি হওয়ায় দুর্গন্ধ একটু কম, না-হলে দূর থেকেই পালিয়ে যেতেন। বাতাস দিলে এই মারাত্মক অসহনীয় দুর্গন্ধ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে জানিয়ে তারা জানান, এক মিনিট দাঁড়াতেই যখন দমবন্ধ হয়ে আসে ; তখন কী ভাবে এলাকার মানুষ বসবাস করছেন অসহায়ের মতো এই প্রশ্ন রাখেন তারা। বালুটিকর গ্রামের ব্যবসায়ী বাদশা মিয়া বলেন, এই ছড়ার পানি ছিল স্বচ্ছ কাচের মতো। নিচে বালু, উপরে টলটলে পানি। ছড়া থেকে মানুষ বালু উত্তোলন করতো এবং খালের পানি খাওয়ার জন্য ব্যবহার করেছে। এখন খালটি বিষাক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে।

কৃষক লুৎফুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, পানি এতোটাই দূষিত যে ধানে পানি লাগলে ধান নষ্ট হয়ে যায়। খালের আশপাশের বোরো ক্ষেতে পানি বেশি প্রয়োজন হলে কৃষকরা খাল থেকে ক্ষেতে পানি দিতে বাধ্য হন। তখন ধান যাতে না মরে শুধুমাত্র সেইটুকু পানি দেয়া হয়। খালের পানি ধানের নিচে আটকে রাখলে ধান নষ্ট হয়ে যায়। দূষিত পানি আর দুর্গন্ধের দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

খালে মাছের প্রাচুর্যের কারণে এলাকার মানুষকে কখনো মাছের জন্য চিন্তা করতে হতো না উল্লেখ করে দাশপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী বংশিধর গ্রামের জাকারিয়া আহমদ বলেন, খালের পানি ছিল পরিষ্কার টলটলে। খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। একবার মাছ ধরতে বের হলে দ্রুতই ‘খলই’ পূর্ণ হয়ে যেতো। দূষণের ফলে এখন মাছ তো দূরের কথা, খালের সামনেই যাওয়া যায় না। মাছের সাথে কীটপতঙ্গ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে।

ষাটোর্ধ্ব মো. আয়াত আলী বলেন, দূষণের ফলে খাল থেকে মাছ বিদায় নিয়েছে। একই সাথে খাল যেখানে হাওরে মিশেছে সেখানে হাকুলি-মাকুলি বিলে পর্যন্ত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। খালের পানি কুশিগাঙ হয়ে সুরমায় গেছে, সেখানেও মাছ নেই। দূষিত পানির কারণে কুশিগাঙে একবার মাছ ভেসে উঠেছিল বলে তিনি জানান।

দোকানদার বাদশা মিয়া কথা বলার সময় একটি কোম্পানীর প্রতিনিধি মালপত্র বিক্রির জন্য আসেন। কথার মধ্যে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বালুটিকর এলাকায় সপ্তাহে তিনি একদিন আসেন। একবার আসা যাওয়া করলেই দুর্গন্ধের কারণে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরবর্তী একদিন পর্যন্ত অস্বস্তিবোধ করেন বলে জানান তিনি।

খালের পারের রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে হয় এসএসসি পরীক্ষার্থী সুজনকে। তার নিকট এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছোট করে তার জবাব-‘এমন অবস্থার মধ্যে ভালো থাকি কীভাবে’। দূষণ ও দুর্গন্ধে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে জানিয়ে কৃষক আব্দুস সোবহান বলেন, বিকট-বিদ্ঘুটে দুর্গন্ধের কারণে টিকে থাকাই দায়। রাত দিন ২৪ ঘণ্টা এই দুর্গন্ধের মধ্যে আমাদের থাকতে হচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে রাত-দিন ঘুমানো যায় না। তিনি বলেন, উপজেলা, ইউনিয়নসহ সব নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা আসলে তাদের খালটি দূষণমুক্ত করার কথা বলেছি। তারাও প্রতিশ্রুতি দিতেন নির্বাচিত হলে খালটি দূষণ মুক্ত করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নির্বাচিত হওয়ার পর কেউই খালটি দূষণমুক্ত করতে কোন পদক্ষেপ নেননি।

আলাপকালে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তিনি উপজেলা, বিসিক সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে বসেছিলেন। আলোচনা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তিতে কোন কাজ হয়নি।’

সিলেট বিসিকের ভারপ্রাপ্ত উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুহেল হাওলাদার বলেন, ‘বিষয়টি তার জানা নেই। এমন হয়ে থাকলে তিনি অবশ্যই ব্যবস্থা নিবেন। তিনি শিগগিরই সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

সবগুলো প্রতিষ্ঠান ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট) বসানোর কথা উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন জানান, ইতিমধ্যে সিলেটে অনেক প্রতিষ্ঠানকে তারা ইটিপি স্থাপনে বাধ্য করেছেন। তিনি তাকে লোকেশনটা দিতে বলেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন।

এই অবস্থা কোনভাবেই চলতে পারে না উল্লেখ করে পরিবেশ আইনজীবী সমিতির সিলেটের সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ শাহেদা এলাকাবাসীকে তাদের নিকট একটি অভিযোগ দেবার পরামর্শ দেন।


এনসি

ফেসবুক পেইজ