ভাটি বাংলার মানুষের মন জয় করেছেন বিদায়ী ইউএনও মতিউর রহমান খান | Sylhet i News
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:৫০ পূর্বাহ্ন

বানিয়াচং প্রতিনিধি :>>

প্রকাশ ২০২১-০৮-১২ ১২:২০:২৪
ভাটি বাংলার মানুষের মন জয় করেছেন বিদায়ী ইউএনও মতিউর রহমান খান

ভাটি বাংলার মানুষের মন জয় করেছেন বিদায়ী ইউএনও মোঃ মতিউর রহমান খান। তিনি ৩৩তম বিসিএসের একজন মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তা। গত ৯ জুলাই ২০২০ইং ইউএনও পদে যোগদান করেন ভাটি বাংলার রাজধানী আজমিরীগঞ্জে। ৫ আগস্ট ২০২১ খ্রি. ছিলো আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ইউএনও হিসাবে তার শেষ কার্য দিবস। গত ১ বছরে তিনি বদলে দিয়েছেন আজমিরীগঞ্জের প্রশাসনিক সেবার চিত্র। গতানুগতিক প্রশাসনকে নিয়ে গিয়েছেন জনমানুষের দোড়গোড়ায়, করেছেন আইনের শাসন।

সরেজমিন তার অফিস পরিদর্শন কালে দেখা যায় গ্রামের গরীব অসহায় মানুষ ন্যায়বিচার পাবার আশায় তাঁর অফিসে এসে প্রতিকার চাইলে তিনি মানুষের অভিযোগ শুনে আইনগত পরামর্শ দেন আন্তরিকতার সাথে। একাধারে তিনি ইউএনও এবং আজমিরীগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক এর দায়িত্ব পালন করেছেন বিচক্ষনতার সাথে। পৌর প্রশাসক হিসাবে তিনি পৌরসভাধীন মসজিদগুলোতে কর্মরত ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের মধ্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে ঈদ উপহার প্রদান করেছেন। তাছাড়া দরিদ্র ও ছিন্নমুল মানুষের মধ্যে পবিত্র ঈদ-উল আযহা উপলক্ষে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর উপহার, খাদ্য সামগ্রী ও ভিজিএফ এর চাল বিতরন করেছেন। তিনি আন্তরিকতার সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ১১৮টি ঘর তৈরীর কাজ সমাপ্ত করে, যথাযথ যাচাই বাছাই এর মাধ্যমে ১০০টি ঘর ভূমিহীনদের মধ্যে হস্তান্তর করেছেন। বাকী ১৮টিও হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন, মিশন ও ডেল্টা প্লানকে বাস্তবায়ন করতে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে ই-নথি কার্যক্রমে সারাদেশের মধ্যে আজমিরীগঞ্জকে উন্নিত করেছেন ঈর্ষনীয় পর্যায়ে। আজমিরীগঞ্জ উপজেলাবাসীর সেবায় তিনি ২৪ ঘন্টা তার মোবাইল চালু রাখতেন। যে কেউ যেকোনো সময় কল দিলে তিনি রিসিভ করে সমস্যা শুনে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি ফেইসবুক পেজ “উপজেলা প্রশাসন আজমিরীগঞ্জ” আইডিতেও ছিলেন সার্বক্ষনিক সরব।

উপজেলাবাসীর যেকোনো সতর্কতা, নির্দেশনা বা অন্যান্য বিষয়ে তিনি ফেইসবুকে পোস্ট দিতেন নিয়মিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগনের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি ১ বছরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন ১৫৩টি, জরিমানা করেছেন ৩,৫৭,৯,৫০/- টাকা এবং জেল দিয়েছেন ৬২ জনের।

পৌরসভার নগর গ্রামে সরকারি খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও খালের পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়েছেন যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা। তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ১৪৪ ধারা এবং ৭ ধারা মামলার আদেশ দানে গতি এনেছেন। মাত্র ২/৩টা শুনানীতেই মামলার নিস্পত্তি করেছেন। এতে জনগনের আস্থা ফিরে এসেছে আদালতের প্রতি। কমেছে মামলাজট। ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের প্রায় সবগুলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন শিক্ষাবান্ধব এই কর্মকর্তা। অনগ্রসর এলাকাগুলোতে চেষ্টা করেছেন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন সময়ে অনলাইন শিক্ষায় শতভাগ এসাইনমেন্ট বিতরনে তার ভূমিকা ছিলো অনন্য। আজমিরীগঞ্জের শিক্ষাকে চালু রাখতে তিনি শিক্ষাবন্ধু আজমিরীগঞ্জ, ডিজিটাল স্টুডিও স্থাপন এবং ডিশ লাইনে ক্লাস প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। যা আজমিরীগঞ্জের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাছে স্মরনীয় হয়ে থাকবে। আজমিরীগঞ্জের শিক্ষার হার বাড়াতে তিনি ছিলেন সচেষ্ঠ। জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করতে ছুটে গিয়েছেন বদলপুর ইউনিয়নের প্রত্যান্ত গ্রাম ঝিলুয়ায়, কাকাইলছেও ইউনিয়নের সলৌরি, রসূলপুর ও আনন্দপুর গ্রামে। নারী অধিকার রক্ষায় বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে করেছেন একাধিক মোবাইল কোর্ট। শীতার্তদের গায়ে উষ্ণতার পরশ দিতে মধ্যরাতে কম্বল নিয়ে পৌছেছেন তাদের বাড়ির উঠোনে। চেষ্টা করেছেন শীত নিবারনের। জনদূর্ভোগ লাগবে পরিবহন খাতেও চালিয়েছেন অভিযান। দ্রুতগতির মোটর বাইক, সিএনজি, অটো রিক্সায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের করেছেন আইনের শাসন। যানজটমুক্ত পরিচ্ছন্ন আজমিরীগঞ্জ গড়তে তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। যাত্রী নিরাপত্তায় তিনি পরিবহন সেক্টরে এনেছেন শৃংখলা। অভিযান চালিয়েছেন ফিটনেস বিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে। ত্রুটিপূর্ণ ও লাইসেন্স বিহীন যানবাহন চালকদের সচেতন করার পাশাপাশি করেছেন অর্থদন্ড। সরকারি আদেশ অমান্য করে আজমিরীগঞ্জ থেকে ঢাকা গামী দূর পাল্লার বাস স্বাস্থ্যবিধি অমান্য এবং যাত্রী হয়রানী করায় বাস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় আইনী ব্যাবস্থা। তাঁর মেয়াদকালীন সময়ে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলো পালনে সকল ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।

আজমিরীগঞ্জবাসীর প্রায়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন সরকারি হাসপাতাল। মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ উদ্ধার করতে মোবাইল কোর্ট করেছেন বাজারের ফার্মেসীগুলোতে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও অতিথি পাখীদের অভয়ারন্য হিসাবে গড়ে তুলতে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে অভিযান চালিয়েছেন অবৈধ পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে। করোনা মোকাবিলায় লকডাউন নিশ্চিতে চষে বেরিয়েছেন প্রতিটি রাজপথ। সরকারিবিধি নিষেধ মেনে চলতে জনগনকে সচেতন করার পাশাপাশি করেছেন আইনের শাসন। লক ডাউনের ফলে কর্মহীন অভাবী মানুষের ঘরে পৌছে দিয়েছেন সরকারি খাদ্য সহায়তা। হোম কোয়ারেন্টাইন ব্যাবস্থাপনা, জনসচেতনতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থবিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনা, ত্রান কার্যক্রম মনিটরিং এবং এ কার্যক্রমে দুর্নীতি হলে তার বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যাবস্থা গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে দুর্নীতিবাজের দলমত না দেখে অপরাধ অনুসারে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। পানিবন্ধী বন্যা দুর্গতদের সহায়তা দেয়ার জন্য ছুটে গিয়েছেন ইসলামপুর, ফতেহপুর, উদ্ধবপুর, ইলামনগর ও পাহাড়পুর রোডসহ বিভিন্ন এলাকায়। তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষন করে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার ও গবাদী পশুর জন্য গো-খাদ্য প্রদান করেছেন।

এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পানিবন্ধী লোকদের মধ্যে সুষ্ঠভাবে ত্রান বিতরন করেছেন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে। ওএমএস এবং টিসিবির কার্যক্রম তদারকি করেছেন স্বচ্ছতার সাথে। অনিয়ম হলে করেছেন আইন প্রয়োগ। তিনি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়ে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করেছেন। আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ইউএনও পদে যোগদানের পর থেকেই ভূমি খেকো ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। খাল-বিল জলাশয়, কৃষি জমি রক্ষায় নিষিদ্ধ ড্রেজার মেশিনের বিরুদ্ধে চালিয়েছেন একাধিক অভিযান।

এক্ষেত্রে প্রভাবশালীরাও আইনের শাসনের বাহিরে থাকেনি। তিনি ১ বছরে খাস জমি বন্দোবস্থ দিয়েছেন ১৪৮ জন ভুমিহীনকে। সরকারি স্বার্থ রক্ষায় খাসজমি পুনরুদ্ধারে নিয়েছেন সাহসী পদক্ষেপ। প্রায় ১০ একর খাসজমি উদ্ধার করেছেন। তাছাড়া শত প্রতিকুলতা সত্বেও প্রায় ৮০ একর আয়তনের ৪টা সরকারি জলমহাল প্রভাবশালীদের হাত থেকে উদ্ধার করে সরকারি ক্যালেন্ডারভুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নথি পাঠিয়েছেন। যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৯টি ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প গ্রহণ করে যথারিতী সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি কালনী, কুশিয়ারা, ভেড়ামোহনা নদী ভাঙ্গনরোধে ও নদীর নাব্যতা রক্ষায় খননের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছেন মন্ত্রনালয়ে। তাঁর প্রস্তাবনায় কাকাইলছেও নদী ভাঙ্গনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিপিপি তে ৫০ কোটি টাকার কাজের ইস্টিমিট প্রেরণ করা হয়েছে। তাছাড়াও তার প্রচেষ্টায় কাকাইলছেও কালনী নদীর পাড়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিবপাশা রোডে দিয়েছেন সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ। আজমিরীগঞ্জবাসীকে মাদক ও জুয়া মুক্ত রাখতে ছুটে বেড়িয়েছেন প্রত্যান্ত গ্রামে। যেখানেই মাদক ও জুয়ার আসর সেখানেই তিনি উপস্থিত হয়ে করেছেন আইনের শাসন। পিঁয়াজ, আলুসহ নিত্য পন্যের মূল্য নিয়ন্ত্রনে রাখতে অবৈধ মুনাফালোভী ব্যাবসায়ীদের বিরুদ্ধেও ছিলেন স্বোচ্ছার। হাওরে দেশীয় পোনামাছ রক্ষায় কালনী, কুশিয়ারা, ভেড়ামোহনা নদীতে অভিযান চালিয়ে আটক করেছেন অবৈধ কারেন্ট জাল। মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধিতে উন্মুক্ত হাওর ও নদীতে অবমুক্ত করেছেন পোনা মাছ।

তাছাড়া কৃষকদের আমন মৌসুমে কৃষি প্রনোদনা বিতরন করেছেন কৃষি বান্ধব এই কর্মকর্তা। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত এবং বন্যাসহ সম্ভাব্য দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তাবপত্র পাঠিয়েছেন মন্ত্রণালয়ে। এছাড়া ইভটিজিং, মাদক, জুয়া, প্রতারনাসহ নানান অপরাধীকে মোবাইল কোর্টের আওতায় এনে জেল জরিমানা করে আজমিরীগঞ্জের আইনশৃংখলা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেকারী এবং খাবার হোটেল ব্যবসায়ীদের বেলায়ও ছিলেন স্বোচ্ছার। সেখানেও করেছেন আইনের শাসন। রাতের আধারে অগ্নিকান্ড পরিদর্শন করে তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছেন আজমিরীগঞ্জের এই অতন্ত্র প্রহরী। মধ্যরাতে ছুটে গিয়েছেন অগ্নি নির্বাপন কাজে নির্দেশনা দেয়ার জন্য। সরকারি দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রিয় সকল দিবসে তার সরব উপস্থিতির পাশাপাশি নিশ্চিত করেছেন পরিষদের অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে রূপন করেছেন শতাধিক ফলজ ও বনজ বৃক্ষ। শিশু কিশোরদের শারীরিক সুস্থ্যতা রক্ষায় আয়োজন করেছেন খেলাধুলার।

বিদায়ী ইউএনও মোঃ মতিউর রহমান খান বলেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ খলিলুর রহমান মহোদয়ের নির্দেশনা ও জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান মহোদয়ের সরাসরি তত্বাবধানে আজমিরীগঞ্জ উপজেলাকে একটি আধুনিক উপজেলা হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর অফিসে আসা সর্বস্তরের মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ চালু করেছিলেন। তিনি আরো বলেন, নিজের এলাকা মনে করে গত ১টি বছর নিরলসভাবে কাজ করেছেন আজমিরীগঞ্জের উন্নয়নে। সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র ৩৩ তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মোঃ মতিউর রহমান খান সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশনে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা পদে বদলী হন। গত ৩১ জুলাই তিনি বদলীর আদেশ পান এবং ৫ আগস্ট আজমিরীগঞ্জে শেষ কার্য দিবস করেন।

আইনিউজ/এসএম

ফেসবুক পেইজ