শরতের প্রেম ও বাংলাসাহিত্য: আল-আমিন | Sylhet i News
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৩৩ পূর্বাহ্ন

আই নিউজ ডেস্ক ::>>

প্রকাশ ২০২১-০৯-১২ ১৯:৫২:১৫
শরতের প্রেম ও বাংলাসাহিত্য: আল-আমিন

আমার কাছে শরতের প্রকৃতি বৃষ্টির পানিতে ধোয়া কিশোরীর মতো স্বচ্ছ। নীলাকাশ জুড়ে অলস মেঘের অবাধ বিচরণ আর খ খ মেঘ বালিকাদের নিজের ইচ্ছেমতো নিরুদ্দেশে যাত্রা এক অপূর্ব সৌন্দর্য্য বহন করে। শরতেই হঠাৎ রোদের ঝলকানি তারপর মেঘের ছায়া। এই রোদ এই বৃষ্টি যেন প্রকৃতির এক ভালোবাসার রঙ ছিটানো মেঘ আর রোদের লুকোচুরি। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কাঁশফুল তরুণীর খোলা চুলের মতো দখিনা বাতাসে ঢেউ খেলা আর বিলের জলজ ফুলের প্রস্ফুটিত রূপ প্রিয়তমার মনের মাধুরী মিশানো সৌরভ শরৎ ঋতুর বার্তা জানান দিয়ে যায়। এই শরতের ভোর বেলায় দূর্বা ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু শৈশবের সেই বালিকা প্রিয়তমার কথাটি মনে করিয়ে দিতে ভুল করে না। আর ভাদ্র মাসের তালের মন মাতানো ঘ্রান নতুন ধানের তৈরি পিঠা, তালের রসের পায়েসের কথা বন্দনা করতে ভুল হয় না কৃষকের। শিউলি ফুটা ভোরে অন্তরজুড়ে স্নিগ্ধতার প্রলেপ বিছিয়ে রাখে শরৎ। এসময় কৃষকের ধানক্ষেত ফসলে সবুজ সমারোহে থাকে অপরুপ। আমি মানুষের মনের আকাশের সাথে শরতের আকাশের আবহাওয়ায় প্রকৃতির অসাধারণ মিল খুঁজে পাই। এই সময়ের আকাশের কালো মেঘ আবার নীল আকাশ দিনের রোদ, না হয় ঝিরিঝিরি হাওয়ায় নৃত্যের তালে বৃষ্টি আমার অসম্ভব ভালোলাগে। হেমন্ত আগমনের হিম শীতল হাওয়া যখন বয়ে চলে বিস্তর কাঁশবনের উপর দিয়ে তখন ইচ্ছে করে দুই হাত দিয়ে কাঁশফুলের পরশ পেয়ে অবাধ ছুটে চলি। আকাশের নীল আর সাদা মেঘের সংমিশ্রণে যখন কাঁশফুলের নীল সাদা ঢেউয়ের তালে তালে উদ্বেলিত হয় তখন শীতল হাওয়া কাঁশফুলের মৃদু ছন্দ তালে ঢেউ খেলে যায় ভালোবাসার হৃদয়ে।


আমি বেখেয়ালেই আনমনে চেয়ে দেখি এই শরতের দৃশ্য। আমি গ্রাম দেখেছি। চিলাই নদীর ভাদ্র মাসের নৌকা বাঁধা খেয়াঘাট দেখেছি। আটিবাঁধা আখ বোঝাই নৌকার মাঝির সলাৎ সলাৎ বৈঠা। নদীর দুইপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁশফুল আর পরন্ত বিকেলের রোদের আলোয়ে শরতের সবুজ ধান খেতের মাঠ আর হিমেল বাতাসে খেলা কাঁশফুলের ঢেউ। দেখেছি গ্রামের কিশোর-কিশোরীদের কাশবনে ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য। নানান ধরনের গ্রামীন খেলার বৈচিত্র। আমি তাদের আনন্দ খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাদের অবাধ ছুটে চলায় দুই একটা কাঁশফুল থুবড়ে পড়ার দৃশ্য এখনো ভুলিনি। শরতের সৌন্দর্যের বিকেলে কিশোর-কিশোরীরা ঘরে বন্দি না থেকে ছুটে বেড়ায় আনন্দে। মিশে যেতে চায় কাঁশফুল বনের অকৃত্রিম হাসিতে। শরতের অভিমান করা হঠাৎ রিমঝিম বৃষ্টিতে ঝরে অজস্র শিউলি ফুল। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পরশ নিয়ে, নগ্ন হাতে কিশোরীর ফুল কুড়ানোর দৃশ্য এসময় আমি অসাধারণভাবে উপলব্ধি করি। শরতের অনিন্দ্য-সুন্দর-সুভাসিত শিউলিমালা যেন প্রেমিকের প্রিয়তমার জন্য। গেঁথে দিতে চায় প্রিয়তমার খোপায়। এই শরতে ভালোবাসা মিশিয়ে একগুচ্ছ কাঁশফুলে শিহরিত হয় ভালোবাসায়।


কাঁশফুলের অধীর শিহরণ নিয়ে আর শিউলির সুমিষ্ট সুবাস নিয়ে শরৎ বাংলায় আসে। প্রিয়তমার দেহে কাঁশফুলের শাড়ির আবরণের মতো করে।

আল- আমিন

এই শরৎ আনন্দের ঋতু। ঋতুর কথা আসলেই শরতের কথা আসে। শরৎপূর্ণতার ঋতু। প্রাচুর্য্যরে ঋতু। এই পাচুর্য্যের ঋতু শরৎকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন কবি সাহিত্যিকরা। শরৎ ঋতুকে রূপবৈচিত্রের সাথে তুলনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। একমাত্র ঋতু শরৎ কুয়াশা ছিড়ে শিউলি ফুলের ভিড়ে খ খ মেঘ হয়ে দূর থেকে কাঁশফুলের সাথে মিশে যায়। ডাহুকের ডাকে আর ঝিরঝির পানিতে শামুকের লুকোচুরি খেলা মনে করিয়ে দেয় শৈশবের দিনগুলো। তাই শরতের নীলাকাশে মেঘমালার দৃশ্য আর ফুটন্ত কাঁশফুলের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-আজি কী তোমায় মধুর রতিহে রিনু শারদ প্রভাতে হে সীতা বঙ্গ শ্যামল অঙ্গ ঝলিছে অমল শোভাতে। বাংলা সাহিত্যে কবি কালিদাস শরৎকে নিয়ে লিখেছেন-প্রিয়তমা আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নববধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত। কবি ঋতুসংহার শরৎকাল বিষয়ে লিখেছেন-কাশফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, অপরূপ যার আকৃতি সেই নববধূর মতো শরৎকাল আসে।

শরতের সাথে প্রকৃতি ও নারীর এই উপমা দেখে অভিভূত করে। বাংলা সাহিত্যের আরেকজন কবি চন্ডীদাস তার কবিতায় বলেন-ভাদর মাঁসে অহোনিশি অন্ধকারে শিখি শিয়াল আর ডাহুক করে কোলাহল। বাংলাসাহিত্যের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎ নিয়ে কবিতা গান রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। শরৎকে করেছেন সৌন্দর্যময়। তিনি লিখেছেন শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি ছড়িয়ে গেল ছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি। শরৎ, তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি। তিনি শরতের বিকেলের নীল আকাশে মেঘেদের দলবেঁধে ছুটে বেড়ানোকে শিমুল তুলার সাথে উপমা দিয়ে লিখেছেন-অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া।এছাড়াও কবির শরৎ নিয়ে রচিত কবিতাগুলোর মধ্যে আমার প্রিয় পঙ্ক্তিগুলো - আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা, নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা। ওগো শেফালি বনের মনের কামনা, শিউলি সুরভিত রাতে বিকশিত জ্যোৎস্নাতে।

শরৎ প্রাতের প্রথম শিশির প্রথম শিউলি ফুলে, হৃদয় কুঞ্জবনে মঞ্জুরিল মধুর শেফালিকা।

রবীন্দ্রনাথের হাতেই শরৎকালীন প্রকৃতির অমেয় রূপের সৌন্দর্যময় অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠেছে। 

ভাদ্র-আশ্বিন জুড়ে শরতের রাজত্ব। বর্ষার শেষে প্রকৃতি নববধূ সাজে সজ্জিত হয়ে উঠে। তরুণ -তরুণীর মাঝে আনন্দের ঝর্ণা ছড়িয়ে দেয় এই ঋতু। শরতের নিজস্বতা মিশে থাকে কাঁশফুলের সঙ্গে। গাছে গাছে ফুটে দোলনচাঁপা, বেলি, শিউলি, টগর, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারাসহ নানা জাতের ফুল। ফুলের সুভাসে বিমোহিত হয়ে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। ঋতুরাজ বসন্তের অভাব পূরনের সৌন্দর্য মিলাতে ঋতুকন্যা শরৎ আমাদের কাছে আসে। আকাশে সাদা মেঘের পালক উড়ে বেড়ানো প্রকৃতির এমন রূপের প্রবল আবেগ আর উৎসাহ এসে জমা হয় সাহিত্যের জগতে। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে প্রকৃতির সাথে মিশে রচিত হয় সাহিত্যজগৎ। 

শরৎ বন্দনায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদানও কম নয়। তিনি অসংখ্য গান ও কবিতায় শরতে বাংলার প্রকৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন -শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ, এসো শারদ প্রাতের পথিক। সহ অনেক গান শরৎ প্রকৃতির রূপ নিয়ে রচনা করেছেন। শরতের অসম্ভব চিত্ররূপময়তা ফুটে তুলেছেন এসব রচনায়। এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে, এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।

বাঙলার প্রকৃতিতে শরৎ আবিস্কার করে নদীর তীরে কাঁশফুলের সাদা হাসির প্লাবন। মাঠে মাঠে সবুজের হৃদয় মাতানো মেলা। নদীর তীরে কাঁশফুলের কমল সাদা রূপে জ্যোৎস্নায় আলোকিত রাতে জাগে স্বপ্নের শিহরণ। অনুপম রূপ সৌন্দর্যমতি শরৎ ঋতু। শরতের মধ্যেই বাংলাদেশের হৃদয়ের সৌন্দর্যরূপ স্পর্শ মেলে।

শরতের প্রকৃতি কিশোরী মনের মতো পরিবর্তনীয় এই বৃষ্টি, আবার কখনো হয়ে ওঠে রৌদ্রকরোজ্জ্বল। এজন্য কবি জসীমউদ্দীন শরতকে তুলনা করেছেন বিরহী নারী সাথে। তিনি বলেছেন- বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাস তার রূপসী বাংলা’ কাব্যের এখানে আকাশ নীল কবিতায় বলেন-এখানে আকাশ নীল-নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল ফুটে থাকে হিম শাদা-রং। এ সময় মাঠ জুড়ে থাকে সবুজ ধানের সমারোহ। ধানের সবুজ পাতায় জমা হওয়া শিশিরের ওপর প্রভাতের তরুণ আলো মুক্তার মতো ছড়ায়। তখন দেশের কৃষকরা নবান্নের আশায় দিন গোনে। শরতের জল-ঝরা শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায়। শরৎ যেমন প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় তেমনি সংস্কৃতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন করে মানুষের ক্লান্তি মোচনের ক্ষেত্র তৈরি করে। অবসাদগ্রস্থ মনে নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। শরতের কাঁশবন আর জ্যোৎস্নায় প্রিয়জন সান্নিধ্যে হারিয়ে যাওয়ার বাসনা প্রবল হয় এই শরতেই।

আর এই শরতের আশ্বিনে ফুটে ওঠা সাদা সাজানো কাঁশফুল হাওয়ায় ঢেউ খেলায় মেতে ওঠে। আর শান্ত ছোট নদীর স্থির জলরাশি, পদ্মা-শাপলা ফুলের প্রেমে ভেসে যায় বিলের দিকে। রাতের শিশিরে ঝড়ে পড়া শিউলি, মেঘমালা, নদীতে পাল তোলা নৌকা এসবের মাঝেই শরৎকে খুঁজে পাওয়া যায়। শরতের ঢেউ খেলা কাঁশফুল প্রিয়তমার খোপায় গোঁজে দেওয়া আর জীবনানন্দ দাসের- তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে বলেছে সে, এতোদিন কোথায় ছিলেন?

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে চাওয়া নাটোরের

বনলতা সেন" এর মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না।

শেষ করার আগে বলার ইচ্ছাটুকু বলেই শেষ করি। ওগো, ওগো প্রিয়তমা মোর, এই ভরদুপুরে উদাস মনে কি চেয়ে দেখ দখিন দিকে। ও বুঝেছি, ঐ কাঁশফুল যাহা তোমায় খোঁপায় দিবো গোঁজে।

লেখক:

কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।


আইনিউজ/এসএ

ফেসবুক পেইজ