শেখ হাসিনার কলাম: বাংলাদেশের চোখে জলবায়ু পরিবর্তন | Sylhet i News
শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০১:৪৫ অপরাহ্ন

আই নিউজ ডেস্ক ::>>

প্রকাশ ২০২১-১১-২৩ ১৮:০১:১৯
শেখ হাসিনার কলাম: বাংলাদেশের চোখে জলবায়ু পরিবর্তন

জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির হুমকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) নেতৃত্বেও এখন তারা। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি দায়ী ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সিভিএফভুক্ত ৪৮টি দেশ। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, এই হুমকি মোকাবিলায় করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি একটি কলাম লিখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় জার্মানিভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা কর্বার ফাউন্ডেশনের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশিকা দ্য বার্লিন পালস-এ। গত সোমবার (২২ নভেম্বর) সেটি পুনঃপ্রকাশ করেছে মার্কিন সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট। জাগোনিউজের পাঠকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর লেখাটির ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশ শক্তিশালী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী অববাহিকার শেষ প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় এখানে জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপর্যয় বেশি দেখা যায়। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্বের একটি অপরিবর্তনীয় ও অনস্বীকার্য ভবিষ্যতের চিত্র ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার।

ক্রমবর্ধমান বর্ষার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বৃষ্টিপাতের মাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে এবং তার প্রভাবে নিয়মিত বন্যা দেখা দেবে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার মারাত্মক হুমকিতে পড়বে, যা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে সংকটে ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ।

আসন্ন এই সর্বনাশ অবশ্য আমাদের অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও আর্থিক প্রস্তুতির স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলোকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বেশ কিছু অভিজ্ঞতা ও কর্মসূচি রয়েছে, যা উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করা যেতে পারে।

এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার মোট ৪৮টি দেশের জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ সর্বাঙ্গীণ ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ প্রণয়নের মাধ্যমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সিভিএফ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম এ ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা গত জুলাইয়ে চালু হয়েছে। কৌশলগত বিনিয়োগ কাঠামোযুক্ত এই পরিকল্পনা জলবায়ু-সম্পর্কিত উদ্যোগ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থায়ন শুরু করতে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে সম্পদ-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে জার্মানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই কর্মসূচির মূল উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তি, শক্তি-সঞ্চয় অবকাঠামো, পাওয়ার-গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং নির্গমন নিয়ন্ত্রণ। এর আওতায় বাংলাদেশের শিল্প এবং অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর আর্থিক সুরক্ষার বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক এবং প্রকৃতিভিত্তিক কৃষি ও মৎস্যসম্পদ, পরিবেশবান্ধব পরিবহন এবং সুস্বাস্থ্য কর্মসূচির বিকাশ এই স্বপ্নদর্শী দলিলের অন্যতম বিষয়বস্তু।

গোটা বিশ্ব যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমার সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করতে সামগ্রিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যার ফলে বিদ্যমান কোভিড-১৯ সংকটের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, সীমিত ভূ-সম্পদ এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।

একই সঙ্গে, বিগত ২০ বছরে আমরা দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েছি। ১৯৭১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আমাদের বার্ষিক ধান উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। আজ পর্যন্ত ১০০টির বেশি উচ্চ-ফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে স্বল্প পানি এবং বেশি তাপ-সহনশীল জাতও রয়েছে। এছাড়া খাদ্যের চাহিদা মেটাতে, সামাজিক চ্যালেঞ্জ প্রশমিত করতে এবং জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় ভাসমান কৃষির চর্চা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সামুদ্রিক বাঁধ, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ এবং উপকূলীয় এলাকায় বৃক্ষরোপণ করেছে। দ্রুত স্থানান্তর নিশ্চিত করতে এবং লাখো মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় নদীতীর ক্ষয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগের সময় স্থানীয় সরকার এবং স্বেচ্ছাসেবকদের ক্ষমতায়ন ও সংগঠিত করতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর একটি ব্যবস্থা।

সবশেষে, আমার সরকার গ্রিনবেল্ট উন্নয়ন ও বনায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ১ কোটি ১৫ লাখের বেশি চারা রোপণ করেছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে রয়েছে সুন্দরবন, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর কার্বন সঞ্চয়ের ক্ষমতা স্থলজ বনের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি।


প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের পথ অনুসরণ করছে। তবে এই রূপান্তরে প্রয়োজনীয় গতি এবং মাত্রা সব দেশের সহযোগিতা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। এভাবে বাংলাদেশ একটি বৈশ্বিক সংগঠন গড়ে তুলতে সহযোগিতামূলক এবং সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানায়, যাতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে সেক্ষেত্রে জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি ও প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মূলত তাদেরই সৃষ্টি।

উন্নত দেশগুলোর উচিত উদ্ভাবনী প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা তৈরি এবং অভিযোজন ও প্রশমনে জলবায়ু তহবিলের সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা করা। বৈশ্বিক সম্প্রদায়গুলো চূড়ান্ত নির্গমন-হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নেতৃত্ব দিতে পারে। আর তা সম্ভব হবে একটি অংশীদারত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি এবং দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো ও জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনে সফল উদ্যোগগুলো থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগানোর মাধ্যমে।

একই সঙ্গে, উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে যেন পরিবর্তিত পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়। কয়েক দশক ধরে এমন দায়িত্বশীল আচরণের ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

আই নিউজ/ এল টি

ফেসবুক পেইজ