সংস্কৃতিকে হত্যার মানে দেশকে হত্যা
সিলেট আই নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ
দেবব্রত রায় দিপন
একটি দেশকে ধ্বংস করতে চাইলে তার ভূখণ্ড বা অর্থনীতিকে নয়—প্রথমে আঘাত হানতে হয় তার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে। কারণ সংস্কৃতিই একটি জাতির আত্মা। সেই আত্মাকে হত্যা করা মানেই জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। পূর্ববঙ্গের মানুষ এই দৃশ্য একবার নয়, বারবার দেখেছে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলার গান, সাহিত্য, নাটক ও লোকসংস্কৃতি ছিল উপেক্ষিত—কারণ তারা জানত, বাঙালির সংস্কৃতি মানেই প্রতিবাদ, স্বাধীনচেতা মনন। ৫৪ বছর পেরিয়ে আজও সেই পুরনো শকুনেরা আবার সক্রিয় হয়েছে—নতুন পোশাকে, নতুন মুখোশে, কিন্তু একই মানসিকতা নিয়ে।
সঙ্গীতের বিরুদ্ধে কেন এই বিদ্বেষ
সঙ্গীত এমন এক মাধ্যম যা মানুষকে মানবিক করে, মনুষ্যত্ব শেখায়, ভেতরের পশুত্বকে পরাজিত করে। একজন সঙ্গীত শিক্ষক খুন করেন না, ধর্ষণ করেন না, ঘৃণা ছড়ান না—বরং তিনি শেখান ভালোবাসা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, এবং সৌন্দর্যের বোধ। তবু আজ কিছু গোষ্ঠী সঙ্গীতকে “অপসংস্কৃতি” বলে চিহ্নিত করছে। তাদের গাত্রদাহ হয়, যখন কোনো স্কুলে জাতীয় সংগীত বাজে, যখন শিশুরা রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলগীতি শেখে। তারা চায়, স্কুলে সঙ্গীত শিক্ষা বন্ধ করে দিতে—কারণ তারা জানে, সঙ্গীত বেঁচে থাকলে অন্ধকার টিকবে না।
শরীরচর্চার বিরুদ্ধেও অযৌক্তিকতা
যে শরীরচর্চা একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মূল ভিত্তি, সেটিও এখন তাদের চোখে “অপচয়” বা “অশোভন”। তারা বোঝে না—শরীরচর্চা শুধু দৌড়ঝাঁপ নয়, এটি আত্মশৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও সম্মিলিত চেতনার বিকাশ ঘটায়। তাদের দাবিতে সরকার নরম অবস্থান নিচ্ছে—এটাই আরও উদ্বেগের। কারণ সংস্কৃতি বা শরীরচর্চা বাদ দিলে শিক্ষা ব্যবস্থাই বিকল হয়ে যাবে। তখন স্কুল হবে শুধু পরীক্ষার যন্ত্র, যেখানে মানুষ নয়, রোবট তৈরি হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে যে ধারা শুরু হয়েছে—তা কেবল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিরুদ্ধেও এক সুপরিকল্পিত আক্রমণ। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার চেতনা, বাঙালিত্ব—সবকিছুকে বিকৃত করে দেওয়া হচ্ছে ধীরে ধীরে। ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে বীরের নাম, বদলে দেওয়া হচ্ছে সত্যকে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি জাতি অস্ত্র দিয়ে নয়, সংস্কৃতি দিয়েই টিকে থাকে। রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের কবিতা, লালনের দর্শন, সুকুমার রায়ের হাসি, জসীমউদ্দীনের গ্রামবাংলা—এসবই আমাদের জাতিসত্তার মূল। এগুলো মুছে দিলে দেশ আর দেশ থাকে না, থাকে কেবল শাসিত একটি ভৌগোলিক সীমানা।
তাই আজ সময় এসেছে আবারও দৃঢ় কণ্ঠে বলার—“সঙ্গীত, সাহিত্য, শরীরচর্চা ও সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ নয়—বরং আরও জোরদার করতে হবে।” কারণ যে জাতি তার সংস্কৃতি ভুলে যায়, সে জাতি ইতিহাসে টিকে থাকে না।
আজকের এই অস্থির সময় আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—স্বাধীনতা কেবল একটি তারিখ নয়, এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। আমাদের সন্তানদের হাতে গিটার, বাঁশি, বই আর বল তুলে দিতে হবে—কারণ এদের হাতেই লুকিয়ে আছে আলোর ভবিষ্যৎ। সংস্কৃতিকে ভালোবাসা মানে দেশকে ভালোবাসা। আর যারা সংস্কৃতিকে হত্যা করতে চায়, তারা মূলত বাংলাদেশকেই হত্যা করতে চায়।
লেখক :
সম্পাদক
প্রথম সিলেট ডট কম
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক
সিলেট আই নিউজ





